রাজশাহীতে পাটে ৫৪৯ কোটি টাকার বাণিজ্যের হাতছানি
অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যায় রাজশাহীতে এবার পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় স্বস্তিতে রয়েছেন জেলার পাটচাষিরা।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, চলতি মৌসুমে উৎপাদিত পাট বিক্রি করে রাজশাহীর কৃষকদের ঘরে আসতে পারে প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাটের এই বড় অঙ্কের বাণিজ্য জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহীর নয়টি উপজেলায় মোট ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ৪৯ হাজার টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত বছর ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়ে উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ টন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার আবাদি জমির পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি উৎপাদনও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
৮২ শতাংশ জমির পাট ঘরে:-
মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, রাজশাহীতে পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ শেষ পর্যায়ে। কৃষি বিভাগের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জেলার মোট আবাদি জমির প্রায় ৮২ শতাংশের পাট সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার ২০০ টন।
কৃষি কর্মকর্তাদের ধারণা, অবশিষ্ট ১৮ শতাংশ জমির পাট সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষ হলে মোট উৎপাদন নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
মণপ্রতি ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা:-
এবার পাটের বাজারদরও চাষিদের আশাবাদী করে তুলেছে। জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে বর্তমানে প্রতি মণ (৪০ কেজি) পাট সাধারণত ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও ভালো মানের পাটের দাম ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
জেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে, প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৩০০ টাকা ধরে হিসাব করলেও চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে প্রায় ৫৪৮ কোটি ৮২ লাখ টাকার পাট বাণিজ্য হতে পারে।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মিতা সরকার বলেন, সরকারি প্রণোদনা, উন্নত জাতের বীজ ও সময়মতো সার সরবরাহসহ কৃষি বিভাগের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে পাটের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে।
তিনি বলেন, প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৩০০ টাকা হিসাবে ধরলেও এবার জেলায় প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকার পাট বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।
পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক নাদিম আক্তার জানান, চলতি বছর জেলায় ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল পাট উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এটি গত বছরের তুলনায় প্রায় ২১ হাজার কুইন্টাল বেশি। বাজারে বর্তমানে ক্ষেত্রবিশেষে মণপ্রতি ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম পাওয়া যাচ্ছে।
ভালো ফলনে কৃষকের মুখে হাসি:-
বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম এলাকার পাটচাষি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গত বছর পাটের দাম আশানুরূপ না থাকায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা ছিল। এবার ফলন ভালো হওয়ার পাশাপাশি দামও সন্তোষজনক। মণপ্রতি ৪ হাজার টাকার বেশি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও লাভ থাকছে।
মোহনপুরের কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় পাট জাগ দেওয়া ও ধোয়ার ক্ষেত্রে এবার তুলনামূলক কম সমস্যা হয়েছে। ভালো দাম পাওয়ায় সংসারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি কিছু টাকা সঞ্চয়ের আশাও করছেন তিনি।
পবার কৃষক রবিউল ইসলাম চার বিঘা জমিতে আগাম জাতের পাট চাষ করেছেন। ফলন ও দাম—দুটোতেই সন্তুষ্ট হলেও তাঁর অভিযোগ, শ্রমিকের বাড়তি মজুরি এবং পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির সংকট এখনো বড় সমস্যা।
বাগমারার সাইদুর রহমান ও চারঘাটের কৃষক হৃদয় বলেন, বর্তমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে পাট চাষের পরিধি আরও বাড়তে পারে।
স্থানীয় বাজার পেরিয়ে যাচ্ছে দেশের গণ্ডি:-
রাজশাহীতে উৎপাদিত পাটের বড় অংশ স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাটকল ও পাটজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে। পাট ও পাটজাত পণ্যের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারিত হওয়ায় রাজশাহীর পাটেরও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন পর্যায়ে কৃষক ভালো দাম পেলেও বাজারব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য থাকলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পুরোপুরি কৃষকের ঘরে পৌঁছাবে না। একই সঙ্গে পাট সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো গেলে এই সম্ভাবনাকে আরও বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া সম্ভব।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকার পাট বাণিজ্য শুধু কৃষকের আয় বাড়াবে না, এর প্রভাব পড়বে পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতে। কৃষকের হাতে অতিরিক্ত অর্থ এলে স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়বে, যা কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে কৃষকের এই সুফল ধরে রাখতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানোর পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে সরাসরি বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ ও পাট প্রক্রিয়াজাতকরণের অবকাঠামো বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সব মিলিয়ে, অনুকূল আবহাওয়া, বাড়তি উৎপাদন ও সন্তোষজনক বাজারদর—এই তিনের সমন্বয়ে এবার রাজশাহীর পাট খাত ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পেলে এই সাফল্য শুধু এক মৌসুমের নয়, আগামী দিনে রাজশাহীর গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।