সাত মাসে ১৫,৯১৭ শিশু নিখোঁজের দাবি,শিশুরা যাচ্ছে কোথায়
সন্তান স্কুলে গেছে, আর ফেরেনি। বিকেলে খেলতে বের হয়ে রাতেও বাড়ি ফেরেনি। কেউ আবার বাড়ির পাশের দোকানে যাওয়ার পর উধাও। সন্তানের অপেক্ষায় রাত কাটছে মা-বাবার। থানায় জিডি হচ্ছে, ছবি ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার পর কত শিশু ফিরে আসছে, কতজন এখনো নিখোঁজ এবং কতজন অপরাধী চক্রের হাতে পড়ছে—তার পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত চিত্র নেই।
এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে চলতি বছরের সাত মাসে ১৫ হাজার ৯১৭ শিশুর নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হওয়ার দাবি। তবে এই সংখ্যার সরকারি উৎস ও পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে সংখ্যাটিকে সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে নিশ্চিত করার সুযোগ নেই। কিন্তু বিষয়টি সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে—দেশে সত্যিই যদি এত বিপুলসংখ্যক শিশু নিখোঁজের অভিযোগ হয়ে থাকে, তাদের কতজনের সন্ধান মিলেছে? আর যারা এখনো ফেরেনি, তারা কোথায়?
ছয় মাসের আরেক পরিসংখ্যানও উদ্বেগের:-
সম্প্রতি প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ৩ হাজার ৪০০ শিশু নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে।
তবে,দুটি সংখ্যার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় বিষয়টি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে। কারণ জিডি হওয়া মানেই প্রতিটি শিশু দীর্ঘদিন নিখোঁজ—এমনটি নয়। অনেক শিশু পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে বা অন্য কোনো কারণে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর দ্রুত ফিরে আসে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিখোঁজের অভিযোগের পর শিশুর সন্ধান পাওয়া গেলেও তা সংশ্লিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যানে কীভাবে হিসাব করা হয়, সেটিও পরিষ্কার নয়।তাই শুধু ‘নিখোঁজের সংখ্যা’ নয়, নিখোঁজ–উদ্ধার–এখনো নিখোঁজ—এই তিনটি আলাদা তথ্য প্রকাশ করাই এখন জরুরি
সিআইডির সতর্কবার্তা: পাচারের শঙ্কা:-
শিশু নিখোঁজের বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)–এর বক্তব্যে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে ‘মুন অ্যালার্ট’ ব্যবস্থা এবং ১৩২১৯ টোল-ফ্রি হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে। সিআইডি জানিয়েছে, কোনো শিশু নিখোঁজ বা অপহৃত হওয়ার যুক্তিসংগত আশঙ্কা দেখা দিলে যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে জরুরি সতর্কবার্তা জারি করা হবে।
সিআইডি প্রধান তখন বলেন, দেশে প্রতিনিয়ত অনেক শিশু নিখোঁজ হচ্ছে এবং তাদের একটি অংশ মানবপাচারের শিকার হচ্ছে। পাচারকারীরা শিশুদের সীমান্তের ওপারে নিয়ে গিয়ে যৌন নির্যাতন, অঙ্গহানি কিংবা বিভিন্ন অবৈধ কাজে ব্যবহার করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টার পাশাপাশি কোনো কোনো ঘটনায় নিকটাত্মীয়দের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়।এমন পরিস্থিতিতে নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনাকে ‘সাধারণ নিখোঁজ’ হিসেবে দেখার সুযোগ কতটা আছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও সীমান্তে ঝুঁকি:-
নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুদের একটি অংশ কোথায় যায়, তা অনুসন্ধানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্রগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে শিশুদের চলাচল নজরদারির আওতায় আনা জরুরি।
বিশেষ করে অভিভাবকের সঙ্গে থাকা অবস্থায় নয়, একা কোনো শিশু দীর্ঘ দূরত্বের ট্রেন বা বাসে ভ্রমণ করলে তার পরিচয় ও অবস্থান যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
একইভাবে রেলস্টেশন ও টার্মিনালের সিসিটিভি ফুটেজ দ্রুত সংরক্ষণ এবং নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা দরকার।
কারণ নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলে শিশুটিকে অন্য জেলা বা সীমান্তবর্তী এলাকায় সরিয়ে নেওয়া সহজ হয়ে যেতে পারে। তখন অনুসন্ধান আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ডিজিটাল যোগাযোগও বড় ঝুঁকি:-
শিশু নিখোঁজের ক্ষেত্রে এখন শুধু রাস্তাঘাট বা অপরাধী চক্র নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন যোগাযোগও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব, প্রলোভন, চাকরি বা ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিশুকে বাইরে ডেকে নেওয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই কোনো শিশু নিখোঁজ হলে তার মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সর্বশেষ যোগাযোগ, অবস্থান এবং পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
নিখোঁজের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাই গুরুত্বপূর্ণ:-
শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারকে থানায় জিডি করার পাশাপাশি দ্রুত শিশুর ছবি, পোশাক, শারীরিক বর্ণনা, সর্বশেষ অবস্থান এবং সম্ভাব্য গন্তব্যের তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিতে হবে।
বাংলাদেশ পুলিশের অনলাইন জিডি ব্যবস্থাতেও হারানো বা নিখোঁজ-সংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে শিশু সুরক্ষায় ১০৯৮ শিশু সহায়তা হেল্পলাইন চালু রয়েছে। শিশু নির্যাতন, পাচার, শিশুশ্রমসহ শিশু অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় এই নম্বরে সহায়তা পাওয়া যায়।
এ ছাড়া নিখোঁজ বা অপহৃত শিশুর তথ্য দ্রুত জানাতে ৯৯৯, ১৩২১৯ এবং সিআইডির মিসিং চিলড্রেন সেল ০১৩২০০১৭০৬০ নম্বরে যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে।
প্রয়োজন ‘নিখোঁজ শিশু ডাটাবেজ’:-
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নিখোঁজের প্রকৃত চিত্র জানতে হলে থানাভিত্তিক জিডির তথ্যকে কেন্দ্রীয়ভাবে সংযুক্ত করা জরুরি। প্রতিটি শিশুর জন্য আলাদা ইউনিক রেকর্ড রেখে সেখানে নিখোঁজের তারিখ, স্থান, বয়স, লিঙ্গ, ছবি, জিডি নম্বর, তদন্ত কর্মকর্তা, সর্বশেষ অবস্থান, উদ্ধার হওয়ার তারিখ ও উদ্ধারস্থল সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে কতজন নিখোঁজ, কতজন উদ্ধার এবং কতজন এখনো নিখোঁজ—এই হিসাব মাসভিত্তিক প্রকাশ করা হলে গুজব ও বিভ্রান্তির সুযোগ কমবে।
২০২৬ সালে সরকার মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে নতুন অধ্যাদেশও জারি করেছে। এতে শিশু পাচারের বিষয়টি আরও কঠোর আইনি কাঠামোর মধ্যে এসেছে।
প্রশ্নের উত্তর মিলবে কবে?:-
১৫ হাজার ৯১৭—সংখ্যাটি শেষ পর্যন্ত সরকারি যাচাইয়ে সঠিক প্রমাণিত হবে কি না, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। কিন্তু এ সংখ্যাকে ঘিরে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর শুধু একটি জিডি নম্বর তৈরি হওয়াই যথেষ্ট নয়। তার সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রের অনুসন্ধান চলতে হবে।কত শিশু নিখোঁজ হয়েছে—তার পাশাপাশি জানতে হবে, কতজন ফিরে এসেছে, কোথা থেকে উদ্ধার হয়েছে, কতজন পাচারের শিকার হয়েছে, কতটি ঘটনায় অপহরণের প্রমাণ মিলেছে এবং কত শিশু এখনো নিখোঁজ।
কারণ প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একজন মা-বাবা এবং একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
আর তাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি শুধু ‘কত শিশু নিখোঁজ?’ নয়—‘নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুরা যাচ্ছে কোথায়?’