৩১ বছরেও হয়নি পশ্চিমাঞ্চল পূর্ণাঙ্গ রেল ভবন॥ জরাজীর্ণ ভবনে চলছে প্রশাসনিক কাজ
তিন দশকেরও বেশি সময় আগে শুরু হয়েছিল আধুনিক রেলভবন নির্মাণের উদ্যোগ। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে ৩১ বছর। কিন্তু ছয়তলা ভবনের বদলে দাঁড়িয়ে আছে মাত্র দুইতলা একটি অসম্পূর্ণ স্থাপনা। প্রশাসনিক দফতরের অনেকগুলো এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, কোনো কোনোটি টিনের ছাউনির নিচে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল রেলওয়ে জমি অব্যবহৃত ও বেদখলে থাকার অভিযোগ। দীর্ঘদিনের এই স্থবিরতা কাটিয়ে এবার আধুনিক বহুতল রেলভবন নির্মাণ, রেলওয়ের জমি উদ্ধার ও আয়বর্ধক কাজে ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে।
ছয়তলার পরিকল্পনা, হয়েছে দুইতলা:-
রাজশাহী বিভাগীয় শহরে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সদর দফতর। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিদ্যমান অবকাঠামো অনেকটাই পুরোনো ও অপ্রতুল। সদর দফতরের আশপাশে টিনের ছাউনিতেও বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ দফতরের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
রেলওয়ে সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী রেলভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৯০ সালে। ইএমসি পশ্চিমের মাধ্যমে ১ কোটি ৯৬ লাখ ৯ হাজার ১৭৮ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মূল অংশে ছয়তলা এবং পাশে চারতলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। ১৬ ইঞ্চি ব্যাস ও ৩০ ফুট দৈর্ঘ্যের ৫৩৪টি পাইলিংয়ের ওপর ২৮ হাজার ২৮০ বর্গফুটের ভবন নির্মাণের কথা ছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের ২৮ জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, নানা অনিয়ম ও জটিলতার কারণে প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত ৫৩৪টির পরিবর্তে ২৩৫টি পাইলিংয়ের ওপর নির্মিত হয় মাত্র ১৭ হাজার ৭৬২ বর্গফুটের দুইতলা ভবন।
অর্থাৎ পরিকল্পিত ছয়তলা ভবনের পরিবর্তে তিন দশক ধরে দুইতলা স্থাপনাই পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সদর দফতরের অন্যতম প্রশাসনিক অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেলের প্রশাসন:-
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রশাসনিক কাঠামো বড় হলেও রাজশাহীতে এর সব দফতর একই স্থানে নেই। বিভিন্ন দফতর বিভিন্ন স্থাপনায় ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও পাকা ভবন, কোথাও পুরোনো স্থাপনা, আবার কোথাও টিনের ছাউনি।ফলে একই জোনের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সমন্বয়ের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মপরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আধুনিক বহুতল রেলভবন নির্মাণ হলে এসব দফতরকে একই ছাদের নিচে আনা সম্ভব হবে। এতে প্রশাসনিক ব্যয় কমানো, সমন্বয় বাড়ানো এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গতি আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়েকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। রাজশাহীতে আধুনিক বহুতল রেলভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আসবে।
শুধু ভবন নয়, জমিতেও নজর:-
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পুনর্গঠনের পরিকল্পনায় শুধু সদর দফতর নয়, রেলওয়ের বিশাল ভূমিসম্পত্তিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় রেলওয়ের জমি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে আছে। এর একটি অংশ স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে থাকার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও আবার ভূমিহীন পরিবার বসবাস করছে।
রাজশাহী নগরীতেও রেলওয়ের জমি বেদখলের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নগরীর সিরোইল কলোনি-হাজরাপুকুর এলাকায় প্রায় ১২ কাঠা রেলওয়ে জমি বেদখলের অভিযোগ ওঠে। ওই জমির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এ ধরনের ঘটনা রেলওয়ের বিপুল ভূমিসম্পত্তি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকেই সামনে আনে।
রেলপথ সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির উদ্যোগে রেলওয়ের পরিত্যক্ত জমির তালিকা তৈরির কথাও জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ জমি উদ্ধার করে সেখানে মার্কেট, বাণিজ্যিক স্থাপনা বা অন্যান্য আয়বর্ধক প্রকল্প নেওয়া গেলে রেলের নিজস্ব রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব।
তবে জমি ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—দখলমুক্তির পর সেগুলো স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা এবং নতুন করে দখলের সুযোগ বন্ধ করা।
১,৮১১ কিলোমিটার রেলপথের বিশাল জোন:-
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল দেশের অন্যতম বড় রেল নেটওয়ার্ক। রেলওয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে রেলপথের পরিমাণ ৩ হাজার ৫৫৩ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে ১ হাজার ৮১১ দশমিক ৫৯ কিলোমিটার।
এই বিশাল নেটওয়ার্কের প্রশাসনিক কেন্দ্র রাজশাহী। ফলে সদর দফতরের অবকাঠামো আধুনিকায়নকে কেবল একটি ভবন নির্মাণের বিষয় হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমে যায়। এটি পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান কার্যালয়, ভূমিসম্পত্তি, নিরাপত্তা, অপারেশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামো রাজশাহীকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা:-
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সম্ভাবনার সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে রাজশাহী-কলকাতা রেল যোগাযোগের উদ্যোগ।
অবিভক্ত বাংলায় মালদহ ও মুর্শিদাবাদ হয়ে রাজশাহীর সঙ্গে কলকাতার রেল যোগাযোগ ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান পৃথক রাষ্ট্র হওয়ার পর সেই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৭৭ বছর পর ২০২৪ সালে রাজশাহী থেকে কলকাতা ট্রেন চালুর উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
প্রস্তাবিত একটি রুট হিসেবে রাজশাহী থেকে :-
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর হয়ে ভারতের সিঙ্গাবাদ, মালদহ, ফারাক্কা, কাটোয়া ও খাগড়াঘাট হয়ে কলকাতার হাওড়া পর্যন্ত যাওয়ার কথা আলোচনায় আসে। এই পথে দূরত্ব প্রায় ৪২৫ কিলোমিটার এবং সময় প্রায় ১১ ঘণ্টা হতে পারে বলে তখনকার রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছিল। তবে রুটটি চূড়ান্ত হয়নি।
রহনপুর-সিঙ্গাবাদ ইন্টারচেঞ্জ ব্যবহার করে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ফলে যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর ক্ষেত্রে বিদ্যমান অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক রেল সংযোগকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
কলকাতা ছাড়িয়ে নেপাল-ভুটানের বাজার:-
রাজশাহী-কলকাতা রেল যোগাযোগ চালু হলে এর প্রভাব শুধু যাত্রী চলাচলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও বাড়বে।
রাজশাহী ও আশপাশের অঞ্চল কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত রেল যোগাযোগ তৈরি হলে কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে নতুন বাজার সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটন ও চিকিৎসার জন্য ভারতে যাতায়াতকারী মানুষেরও সময় ও ব্যয় কমতে পারে।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি বলেন, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে এর প্রভাব পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে পড়বে। ভারতের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হলে মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেরও নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
‘নবযৌবনের’ অপেক্ষায় পশ্চিমাঞ্চল:-
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ বলেন, রেলের উন্নয়নে সরকার বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। খুব শিগগিরই পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের উন্নয়নে বেশ কিছু সুখবর আসবে বলে আশা করছি। রাজশাহীতে আধুনিক বহুতল রেলভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে রেলের কার্যক্রমে গতি ফিরবে।
তবে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ১৯৯০ সালে যে রেলভবনের স্বপ্ন শুরু হয়েছিল, সেটি ১৯৯৪ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আজও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। ফলে এবার নতুন ভবনের পরিকল্পনা যেন আরেকটি দীর্ঘসূত্রতার শিকার না হয়—এটাই সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
একইভাবে রেলওয়ের জমি উদ্ধার ও আয়বর্ধক প্রকল্প বাস্তবায়নেও দরকার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা। আর রাজশাহী-কলকাতা রেল যোগাযোগের উদ্যোগ বাস্তবে রূপ নিলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সামনে খুলতে পারে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের নতুন দুয়ার।
তিন দশকের অসমাপ্ত রেলভবন, বেদখল জমি আর বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোর জায়গায় যদি এবার আধুনিক অবকাঠামো, সুশৃঙ্খল ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগ একসঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের চেহারায় সত্যিই আসতে পারে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন।