বিদ্যুৎ সংকটে ধুঁকছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো
চলমান বিদ্যুৎ সংকটে ঢাকার বাইরের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক জায়গায় দিনে ৬ থেকে ৮ বার লোডশেডিং চলছে। ফলে তীব্র গরমে নাকাল রোগী ও চিকিৎসকরা। তৃণমূলের এসব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে জেনারেটরের ব্যবস্থা না থাকায়, পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। জীবনের নিঃশ্বাস যেখানে বেঁচে থাকার শ্বাস খোঁজে, সেখানেই এখন নাভিশ্বাস। চলমান বিদ্যুৎ সংকটে আলোহীন অবস্থায় ধুঁকছে ঢাকার বাইরের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো। ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ত্রাহী অবস্থা রোগীদের। সুই সিরিঞ্জের পাশে এখন হাতপাখা, আর বেডের পাশে মুঠোফোনের টর্চ।
ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত তিন চারদিন থেকে সারাদেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। দিন ও রাতের বড় একটা সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন জেলার পৌর এলাকার বাইরে যেসব এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে সে সব জায়গায় লোডশেডিংয়ের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারাও অবশ্য সেটি মানছেন। তারা বলছেন, কোথাও লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩০ শতাংশ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্তও বাড়ছে।জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই তিন মাস দেশে গরম যেমন বাড়ে, তেমনি বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। তবে এবার জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।
ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা ৩টা। মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিদ্যুৎ নেই ঘণ্টাখানেক। ৪ দিন ধরে ভর্তি আওয়াল মোল্লা জানালেন, দিনের চেয়ে রাতের অবস্থা আরও নাজুক। তিনি জানান, রাতে বিদ্যুৎ থাকে না, যাদিও আসে ১০/২০ মিনিট থেকে আবার চলে যায়। প্রচণ্ড গরমে জ্বরটা আরও বেড়েছে ছয় বছরের জান্নাতের। লোডশেডিংয়ের সময় শহরের হাসপাতালে হয়তো জেনারেটরে মুক্তি মেলে। কিন্তু, এখানে সেই ব্যবস্থাও নেই। বিদ্যুৎ গেলে আর আসার খবর থাকে না। এখানে বহির্বিভাগে লাইনে থাকা রোগীদের সাথে যারা আসেন তারাও যেনো রোগী হয়ে যান। মাসখানেক ধরে এমন অবস্থা চললেও খোঁজ নিচ্ছে না কেউ।
ভুক্তভোগীরা জানান, বাসায় বিদ্যুৎ নেই, হাসপাতালেও একই অবস্থা। বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের কারণে অনেকে অজ্ঞান হয়ে যান। কেবল সিঙ্গাইর নয়, রাজধানী ঢাকার আশপাশের মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর চিত্র প্রায় একই। দিনে ৬ থেকে ৮ বার লোড শেডিংয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে জরুরি বিভাগ, প্যাথলজি ও অপারেশন থিয়েটারে। মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও সৈয়দ ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আমাদের হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আসলে নেই। চিকিৎসার জন্য অনেক জরুরি রোগী আসেন। সেই জন্য পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
মেহেরপুরের আসাদুজ্জামান লিটন তার এলাকার পরিস্থিতি তিনি বর্ণনা করে বলেন, সকাল ৯টায় কারেন্ট গিয়ে ১০টায় আসছে, ১১টায় আবার গিয়ে ১২টায় আসছে। পরে একটার দিকে আবার কারেন্ট গিয়ে সেই কারেন্ট এসেছে বিকেল তিনটায়। এরপর তিনটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত ছিল। সাড়ে চারটায় গিয়ে সাড়ে পাঁচটায় আবার কারেন্ট আসছে। লিটন জানান, তিনি যে এলাকায় থাকেন সেটি শহর বা পৌরসভার বাইরে। পৌরসভার বাইরের বিদ্যুৎ সরবারহ করে থাকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। আর শহরের বাইরেই এই লোডশেডিং সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত চারবার লোডশেডিং হয়েছে। প্রত্যেকবারই এক থেকে দুই ঘণ্টা করে লোডশেডিং হয়। প্রচণ্ড গরম, ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি তাপমাত্রা। কারেন্ট গেলে বাসার বাইরে বের হতে হয়। হাতপাখা দিয়ে বাতাস করা ছাড়া আর উপায় নেই।
লালমনিরহাট থেকে ফারাহ ফিবা নামে একজন গৃহিণী জানান, তিনি যে এলাকায় থাকেন সেটি পৌরসভার মধ্যে। পৌর এলাকায় থাকায় দিনে দুই তিনবার, কিংবা কখনো তারও কম লোডশেডিং হচ্ছে। তবে শহরের বাইরে তার পরিচিত যারা আছেন তাদের অভিযোগ লোডশেডিং বাড়ছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার হেমসেন লেন এলাকার একজন বাসিন্দা জানান, গত কয়েকদিন ধরেই বার বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বিকাল নাগাদ অন্তত চার বার লোডশেডিং হয়েছে। ময়মনসিংহের স্থানীয় সাংবাদিক আতাউর রহমান জুয়েল জানান, সম্প্রতি বিভাগের সব জেলাতেই লোডশেডিং বেড়েছে বলে অভিযোগ আসছে। বিভাগের ছয় জেলায় দিনে গড়ে ১০৭৫ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩২৫ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুতের ঘাটতি হচ্ছে বলে পিডিবি সূত্রের বরাত দিয়ে জানান তিনি।