মেসির অবসরের খুঁটিনাটি : তিনটি পৃষ্ঠা, হ্যারি পটার কলম ও আবেগঘন ভিডিও

Three pages, a Harry Potter pen and an emotional video
অনলাইন ডেস্ক ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:১৭ পূর্বাহ্ন খেলা
অনলাইন ডেস্ক ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:১৭ পূর্বাহ্ন
মেসির অবসরের খুঁটিনাটি : তিনটি পৃষ্ঠা, হ্যারি পটার কলম ও আবেগঘন ভিডিও
--সংগৃহীত ছবি

লিওনেল মেসি তার কথাগুলোকে এমন একটি অধ্যায়ে রূপ দিতে চেয়েছিলেন, যা অনন্তকাল থেকে যাবে। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সঙ্গে ২০ বছরের বেশি সম্পর্ক। তার ইতি টেনে দিলেন রূপকথার মতো আবহ তৈরি করে। তার ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে তুলে ধরে একটি ভিডিও বার্তা দিলেন। তার অবসরের ঘোষণা কেবল কিছু শব্দের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বার্তার সঙ্গে তিনি যে ছবিটি বেছে নিয়েছিলেন, তাও ছিল প্রতীকী অর্থ ও সূক্ষ্ম বিষয়ে পরিপূর্ণ।

​একটি নোটপ্যাডের তিনটি পাতায়, নিজের হাতে বড় হাতের অক্ষরে মেসি একটি বার্তা লিখেছেন, যেখানে জাতীয় দলের সঙ্গে তার দুই দশকের ইতিহাস দৃশ্যমান হয়ে ফুটে উঠেছে। সিদ্ধান্তটি যে কতটা ভারী, তা লেখার শুরুতেই স্পষ্ট। এই চিঠিতে উঠে এসেছে দুই দশকের স্মৃতিকথা, আর শেষ হয়েছে এমন একটি বাক্যে যা দেশের সাথে তার অটুট বন্ধনকে ফুটিয়ে তোলে। শেষটা ছিল, ‘আমাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! এগিয়ে যাও আর্জেন্টিনা!’

​তবে সেই পৃষ্ঠাগুলোর মাঝে বিশেষ একটি জিনিস হঠাৎ সবার নজর কেড়ে নেয়: একটি সোনালি রঙের হ্যারি পটার কলম।

বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এক কলম

মেসি তার বিদায়ী বার্তা লিখতে যে কলমটি ব্যবহার করেছেন, সেটি সাধারণ কোনো কলম নয়। কলমটির ওপরের অংশে রয়েছে ‘টাইম-টার্নার’, যা জে. কে. রোউলিংয়ের হ্যারি পটার সিরিজের হারমায়োনি গ্রেঞ্জারের একটি অতি পরিচিত জাদুকরী বস্তু। কলমটির উপরে রয়েছে এর ঐতিহ্যবাহী গোলাকার আকৃতি এবং মাঝখানে একটি ছোট বালুঘড়ি।

​এছাড়া সোনালি প্রলেপ দেওয়া ধাতব বডিতে কালো রঙে হ্যারি পটারের অফিশিয়াল লোগো খোদাই করা রয়েছে। বলা দরকার যে, মেসি, তার স্ত্রী ও সন্তানেরা সবাই এই জাদুকরী সিরিজের দারুণ ভক্ত।

​প্রেক্ষিত বিবেচনা করলে এই বিষয়ের গুরুত্ব আরও গভীর হয়ে ওঠে। হ্যারি পটারের গল্পে ‘টাইম-টার্নার’ এমন এক জাদুকরী বস্তু, যা দিয়ে সময়কে পেছনে ঘুরিয়ে নেওয়া যায়। আর মেসি ঠিক এমন একটি চিঠির ওপর কলমটি রেখে দিয়েছেন, যেখানে তিনি জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকে কেটে যাওয়া ২০ বছরের কথা বলছেন।

​দৃষ্টিসীমার এই মিল এড়িয়ে যাওয়া কঠিন, যে মানুষটি আর্জেন্টিনা জার্সিতে তার ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিচ্ছেন, তিনি সময় পেছনে নেওয়ার প্রতীকী বস্তুটি ব্যবহার করেই সময়ের বয়ে যাওয়ার গল্প লিখছেন।

​কারণ মেসির এই বার্তার সবখানে জড়িয়ে রয়েছে কেবলই ‘সময়’। বছরের পর বছর ত্যাগ, পরাজয়, তীব্র সমালোচনা, একের পর এক ফাইনাল হার এবং সবশেষে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয়ের সেই সোনালি অধ্যায়।

​তিনটি পৃষ্ঠায় শেষ ২০ বছরের গল্প

একটি নোটপ্যাড থেকে ছিঁড়ে নেওয়া তিনটি সাধারণ পৃষ্ঠায় খেলা হয়েছে মেসির দুই দশকের গল্প। সাধারণ এই পৃষ্ঠাগুলোর ওপরে সপ্তাহের দিন, ছোট ছোট আইকন এবং তারিখ বসানোর জায়গা ছিল, কিন্তু সে অংশগুলো পুরোপুরি খালি রাখা হয়েছে।

​মেসি সেগুলোকে বিশেষ কিছুতে রূপান্তর করেছেন। তিনি সরু টানের কালো কালিতে, সব বড় হাতের অক্ষরে লিখেছেন। এমনকি মাঝপথে লিখতে গিয়ে কিছু কাটাকাটি ও সংশোধনও স্পষ্ট দেখা যায়, যা তৎক্ষণাৎ মন থেকে লেখা বার্তার পরিচয় দেয়। পৃষ্ঠাগুলো বাম থেকে ডানে সাজানো, যা পড়ে মনে হয় এটি যেন জাতীয় দলের সাথে তার গল্পের শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা।

​প্রথম পাতায় রয়েছে সিদ্ধান্তটির গুরুভার। মেসি তার সবটুকু উজার করে দেওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করে বিদায়ের অন্যতম শক্ত উক্তিটি লিখেছেন, ‘আমি আমার সবটুকু দিয়েছি... নিজেকে একদম খালি করে দিয়েছি, আমার মধ্যে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।’ 

এখানে কোনো কৃত্রিম বা নিরপেক্ষ বক্তব্য নেই। বরং রয়েছে এক ধরনের ক্লান্তি, এক অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে নেওয়া এবং এটি শেষ হয়েছে তা মেনে নেওয়ার বাস্তবতা।

​দ্বিতীয় পৃষ্ঠাটি যেন তার পুরো পথচলার বিবরণ। ‘এই ২০ বছরের সব ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ,’ লিখে মেসি জাতীয় দলের হয়ে নিজের পথচলার কথা স্মরণ করেছেন এবং তার পরিবার, সতীর্থ, কোচিং স্টাফ ও কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এটি চিঠির সবচেয়ে স্মৃতিচারণমূলক অংশ—দুই দশক আগে শুরু হওয়া যাত্রা এবং জাতীয় দলের হয়ে একজন ফুটবলারের জীবনে যা কিছু ঘটা সম্ভব, তার এক স্মৃতিরোমন্থন।

​তৃতীয় পৃষ্ঠায় এসে স্বর আবারও বদলে যায়। শেষটা অত্যন্ত আবেগপূর্ণ, সরাসরি এবং নিখাঁদ আর্জেন্টাইন মেজাজে, ‘আমাকে আর্জেন্টাইন করার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ!! এগিয়ে যাও আর্জেন্টিনা।’

​এভাবেই বিদায় শেষ হয়, যেমনটা জাতীয় দলের হয়ে তার গল্পের শুরু হয়েছিল—যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আর্জেন্টিনার জার্সি।

​বিদায়ের সাথে প্রকাশিত সেই ভিডিও

​শুধু চিঠিই নয়, মেসি আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সঙ্গে তার সেরা মুহূর্তগুলোর কিছু ছবি নিয়ে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন, যা আর্জেন্টিনার হয়ে তার ইতিহাসের এক দৃশ্যমান যাত্রা।

​সেখানে তার ক্যারিয়ারের বিভিন্ন ধাপ তুলে ধরা হয়েছে: আর্জেন্টিনা জার্সিতে তার প্রথম পদক্ষেপগুলো, বড় বড় টুর্নামেন্টগুলো, হতাশার মুহূর্তগুলো এবং সেই ঐতিহাসিক জয়গুলো যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলের সঙ্গে তার সম্পর্ককে বদলে দিয়েছিল।

​ভিডিওটি চিঠির পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে। তিনটি পৃষ্ঠা যখন মেসির নিজের কথায় শেষটাকে বর্ণনা করেছে, ভিডিওর দৃশ্যগুলো তখন সেই কথাগুলোকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দিয়েছে।

একটি ন্যাপকিন পেপারে মেসির সঙ্গে বার্সার চুক্তির সেই কথা মনে আছে! সেই ন্যাপকিন ইতিহাস হয়ে আছে, ঠিক তেমনই এই তিনটি পৃষ্ঠা ও হ্যারি পটার কলমও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।