রাজশাহীতে ডেঙ্গুতে মৃত্যু, দ্বিগুণ এডিস ঘনত্ব দেশে ২৪ ঘণ্টায় ১১৬৩ আক্রান্ত, মৃত্যু ৯৭
রাজশাহীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। নগরীতে এডিস মশার প্রজনন ঘনত্ব বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছানোর মধ্যেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আব্দুল হান্নান (৩৯)। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা।
একই সময়ে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সর্বশেষ ৩১ আগস্ট ২৪ ঘণ্টায় দেশে ১ হাজার ১৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা চলতি বছরের এক দিনে সর্বোচ্চ। এ সময়ে দেশে আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৭ জনে এবং মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫৮৪৬।
রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আব্দুল হান্নানকে গত রোববার (৩০ আগস্ট) ভোর ৩টা ৫৪ মিনিটে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় একই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। সোমবার (৩১আগস্ট)বিষয়টি নিশ্চিত করেন রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামিম আহমেদ।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় রামেকে নতুন করে ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ১৭ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ৪৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রোগীর সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসাসেবায় হাসপাতালের প্রস্তুতি রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হওয়ায় তা দ্রুত ধ্বংসের ওপর জোর দেন তিনি।
দুই মাসে দ্বিগুণ এডিসের ঘনত্ব:-
ডেঙ্গুর রোগী বাড়ার পাশাপাশি রাজশাহী নগরীতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার ঘনত্বও দ্রুত বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপে নগরীর ৫টি এলাকায় এডিস মশার প্রজনন ঘনত্বের ব্রেটো সূচক পাওয়া গেছে ৬১ দশমিক ৩৩। মে মাসে এ সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে সূচক প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
WHO-এর কারিগরি নির্দেশনায় ব্রেটো সূচক মশার লার্ভা-সমৃদ্ধ প্রজননস্থলের ঘনত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। পুরোনো WHO নির্দেশিকায় ৫০-এর বেশি ব্রেটো সূচককে উচ্চ সংক্রমণঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
রাজশাহীর সর্বশেষ ৬১ দশমিক ৩৩ সূচক সেই তুলনায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে শুধু একটি সূচকের ভিত্তিতে কোনো এলাকায় রোগের প্রকৃত সংক্রমণমাত্রা নির্ধারণ করা যায় না; রোগীর সংখ্যা, মশার প্রজাতি, পরিবেশ ও অন্যান্য মহামারিবিদ্যাগত তথ্যও বিবেচনা করতে হয়।
বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বাড়ছে প্রজননস্থল:-
বর্ষায় বাড়িঘরের ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন অংশ, ড্রাম, প্লাস্টিকের পাত্র ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। ফলে নিয়মিত মশক নিধনের পাশাপাশি পানি জমতে না দেওয়া এবং জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো বাহক মশা নিয়ন্ত্রণ। দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা গুরুতর ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে পারে।
আগস্টেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি:-
দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে, ৩১ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মারা গেছেন চারজন। চলতি বছরের এক দিনে এটাই সর্বোচ্চ রোগী ভর্তি ও সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। চলতি আগস্ট মাসেই ডেঙ্গুতে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর আগে ৩০ আগস্ট ২৪ ঘণ্টায় ১০৯৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং ৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। অর্থাৎ মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে মোট ৩৫ হাজার ৮৪৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছর দেশে ডেঙ্গুতে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন আক্রান্ত ও ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলে বাড়ছে চাপ:-
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী বিভাগে ৮৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে খুলনা বিভাগে ২৮৩, ঢাকা বিভাগে ৪৬৪, চট্টগ্রামে ১২০, বরিশালে ১৩২, ময়মনসিংহে ৬৯, রংপুরে ৭ এবং সিলেটে একজন ভর্তি হয়েছেন।
এর ফলে ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা নয়—দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে রাজশাহী, খুলনা ও অন্যান্য বিভাগে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্থানীয় হাসপাতালগুলোর ওপরও চিকিৎসার চাপ বাড়ছে।
শুধু মশক নিধন নয়, দরকার সমন্বিত উদ্যোগ:-
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ ছিটিয়ে বা মশা মারার কর্মসূচি চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এডিসের প্রজননস্থল শনাক্ত করে তা ধ্বংস, নিয়মিত কীটতাত্ত্বিক জরিপ, নির্মাণাধীন ভবন ও আবাসিক এলাকায় নজরদারি, জলাবদ্ধতা দূর করা এবং নাগরিকদের সম্পৃক্ত করা জরুরি।
WHO-ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ভেক্টর সার্ভেইল্যান্স, মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি সংরক্ষণ পদ্ধতি ও জলাবদ্ধতাও ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চিকিৎসা প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রতিরোধেই জোর:-
সরকারি পর্যায়ে ডেঙ্গু চিকিৎসায় প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। জুনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ডেঙ্গু মৌসুম সামনে রেখে স্যালাইনের মজুত বাড়ানো হয়েছে এবং চাহিদা বাড়লে অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রস্তুতি রয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজও ডেঙ্গু চিকিৎসায় এক লাখ আইভি স্যালাইন সরবরাহ করেছিল।
তবে চিকিৎসাব্যবস্থার প্রস্তুতির পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ। রাজশাহীতে মাত্র দুই মাসে এডিসের ব্রেটো সূচক দ্বিগুণ হয়ে ৬১ দশমিক ৩৩-এ পৌঁছানো এবং রামেক হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকা সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপ্টেম্বরের শুরুতেই যদি নগরীর পানি জমার স্থানগুলো চিহ্নিত করে ধ্বংস, নিয়মিত মশক জরিপ ও কার্যকর নিধন অভিযান জোরদার করা না যায়, তাহলে রাজশাহীতে ডেঙ্গুর চাপ আরও বাড়তে পারে। আর জাতীয় পর্যায়ে আগস্টের রেকর্ড সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।