রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে লোকোমোটিভ অচল, অপচয়ের ঝুঁকিতে রেলের কোটি টাকার সম্পদ
বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোমোটিভ বহরে একদিকে ইঞ্জিন সংকট, অন্যদিকে বিদ্যমান ইঞ্জিনের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, মেরামত ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে সচল রাখা সম্ভব এমন কিছু লোকোমোটিভকে হঠাৎ করে পরিষেবা থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। এতে রেলের সক্ষমতা কমার পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিপুল অর্থে কেনা মূল্যবান সম্পদ অযত্নে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একটি লোকোমোটিভে সাময়িক ত্রুটি দেখা দিলেই সেটিকে দীর্ঘদিন বসিয়ে রাখার প্রবণতা রয়েছে। অথচ বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব ওয়ার্কশপ, ডিজেল শপ ও কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপ রয়েছে, যেখানে লোকোমোটিভের মেরামত, ভারী মেরামত ও ওভারহলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে ইঞ্জিনগুলোকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় রেখে কর্মক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সংস্থাটির লোকোমোটিভ বহরে মোট ২৭২টি ইঞ্জিন ছিল। এর মধ্যে ১৭৮টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক এবং ৯৪টি ব্রডগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ। এসব ইঞ্জিনের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পাহাড়তলী ও ঢাকা ডিজেল ওয়ার্কশপ এবং পার্বতীপুর ডিজেল ওয়ার্কশপ রয়েছে। আর ডিজেল লোকোমোটিভের ভারী মেরামত ও ওভারহলিংয়ের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপ, পার্বতীপুরের।
অর্থাৎ রেলওয়ের লোকোমোটিভ সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি কাঠামো নতুন করে তৈরি করার বিষয় নয়; দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের অবকাঠামো সংস্থাটির রয়েছে।
দায়িত্ব নির্দিষ্ট, তাহলে অচল কেন?:-
বাংলাদেশ রেলওয়ের সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টনেও লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি স্পষ্ট। অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) কার্যালয়ের দায়িত্বের মধ্যে সব রোলিং স্টকের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, সাধারণ ওভারহলিং ও পরিবর্তন, পাশাপাশি ওয়ার্কশপ, শেড ও ডিপোর ব্যবস্থাপনা রয়েছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলীর দায়িত্বের মধ্যেও সব লোকোমোটিভ ও রোলিং স্টককে কর্মক্ষম অবস্থায় রাখার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে ওয়ার্কশপ, ডিজেল ওয়ার্কশপসহ সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলো সচল রেখে সর্বোচ্চ উৎপাদন বা সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাঁর।
এ অবস্থায় কোনো লোকোমোটিভ দীর্ঘদিন পরিষেবার বাইরে পড়ে থাকলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—ইঞ্জিনটির প্রকৃত ত্রুটি কী, সেটি মেরামতযোগ্য কি না, মেরামতে কত ব্যয় হবে এবং কেন সেটিকে পুনরায় বহরে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি?
পুরোনো মানেই বাতিল নয়:-
রেলের লোকোমোটিভের বয়স বেশি হলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অচল বা বাতিল করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ইঞ্জিনের অবস্থা নির্ধারণে প্রয়োজন কারিগরি পরিদর্শন। ইঞ্জিনের মূল কাঠামো, ইঞ্জিন, ট্র্যাকশন মোটর, জেনারেটর, ব্রেকিং সিস্টেম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের অবস্থা পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—কোনটি সাধারণ মেরামতে, কোনটি ভারী মেরামতে এবং কোনটি ওভারহলিংয়ের মাধ্যমে পুনরায় চালানো সম্ভব।
বাংলাদেশ রেলওয়ের সরকারি তথ্যেও লোকোমোটিভের ভারী মেরামত ও ওভারহলিংয়ের জন্য কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপের কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ একটি লোকোমোটিভকে পরিষেবা থেকে সরিয়ে রাখাই একমাত্র সমাধান নয়; কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে পুনর্বাসনের সুযোগও রয়েছে।
বসিয়ে রাখলে বাড়ে ক্ষতি:-
কোনো লোকোমোটিভ দীর্ঘদিন ব্যবহার না করে খোলা আকাশের নিচে বা অনুপযুক্ত পরিবেশে ফেলে রাখলে সময়ের সঙ্গে তার বিভিন্ন যন্ত্রাংশের অবনতি ঘটতে পারে। ফলে যে ত্রুটি শুরুতে তুলনামূলক কম ব্যয়ে মেরামত করা সম্ভব ছিল, দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকলে সেটি আরও বড় মেরামতের প্রয়োজন তৈরি করতে পারে।
এতে রেলওয়ের দ্বৈত ক্ষতি হয়। প্রথমত, একটি বিদ্যমান লোকোমোটিভ থেকে আয় ও সেবা পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, ট্রেন পরিচালনা স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প ইঞ্জিনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। একই ইঞ্জিনকে বেশি সময় ও বেশি ট্রিপে ব্যবহার করলে সেটির ওপরও রক্ষণাবেক্ষণের চাপ বাড়ে।
ইঞ্জিন সংকটের প্রভাব পড়ে ট্রেন পরিচালনায়:-
লোকোমোটিভ শুধু ট্রেন টানার যন্ত্র নয়; পুরো রেল পরিচালন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সম্পদ। বাংলাদেশ রেলওয়ের অপারেটিং ব্যবস্থায় লোকোমোটিভ বিভিন্ন বিভাগে বণ্টন এবং সেগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ ও শপিংয়ের জন্য পাঠানোর দায়িত্বও নির্ধারিত রয়েছে। একই সঙ্গে লোকোমোটিভের ব্যবহার ও সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের পরিকল্পনা করাও দায়িত্বের অংশ।
ফলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মক্ষম লোকোমোটিভ না থাকলে ট্রেন পরিচালনায় স্বাভাবিকভাবেই চাপ তৈরি হয়। কোনো ইঞ্জিন বিকল হলে বিকল্প ইঞ্জিনের ব্যবস্থা, ট্রেনের সময়সূচি সমন্বয়, ক্রু ব্যবস্থাপনা এবং অন্য ট্রেনের ওপর প্রভাব—সবকিছু মিলিয়ে একটি ছোট কারিগরি সমস্যা বড় পরিচালনাগত সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
রেলের ঘোষিত লক্ষ্যই বলছে ‘রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেড’:-
বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব ভিশন ও মিশনেও লোকোমোটিভ ও রোলিং স্টক রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিকায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সংস্থাটির ঘোষিত মিশনের মধ্যে লোকোমোটিভ, কোচ ও অন্যান্য রোলিং স্টক রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নত করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি উন্নয়ন ও রাজস্ব বাজেটের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যও রয়েছে।
এই নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে যদি বাস্তবে কর্মক্ষম বা মেরামতযোগ্য লোকোমোটিভকে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া পরিষেবার বাইরে রাখা হয়, তাহলে সেটি ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
নতুন ইঞ্জিন কেনার আগে পুরোনো সম্পদের হিসাব জরুরি:-
রেলওয়ে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে বিদ্যমান বহরের কোন ইঞ্জিন কতটা ব্যবহারযোগ্য, কোনটি পুনর্বাসন করা সম্ভব এবং কোনটি প্রকৃত অর্থেই অর্থনৈতিকভাবে মেরামতের অযোগ্য—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব থাকা জরুরি।
একটি পুরোনো লোকোমোটিভকে সামান্য যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ও মেরামতের মাধ্যমে সচল করা গেলে সেটি অনেক ক্ষেত্রে নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের বিকল্প নয়, বরং বহরের ওপর চাপ কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে। তাই শুধু ‘পুরোনো’ পরিচয়ে কোনো ইঞ্জিনকে বাতিল বা পরিষেবার বাইরে রাখার পরিবর্তে কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
তদন্ত হওয়া দরকার:-
সংশ্লিষ্টদের দাবি, পরিষেবা থেকে সরিয়ে রাখা প্রতিটি লোকোমোটিভ নিয়ে আলাদা কারিগরি অডিট হওয়া উচিত। সেখানে অন্তত পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর বের করা দরকার—
১(লোকোমোটিভটি কেন পরিষেবা থেকে সরানো হয়েছে?
২( সর্বশেষ কবে সেটির রক্ষণাবেক্ষণ বা ওভারহলিং করা হয়েছিল?৩)বর্তমানে ইঞ্জিনটির কী কী ত্রুটি রয়েছে এবং সেগুলো মেরামতযোগ্য কি না?৪)মেরামত করলে আনুমানিক কত টাকা লাগবে এবং নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহের তুলনায় সেই ব্যয় কত?৫). ইঞ্জিনটি কতদিন ধরে অচল এবং এতদিন সেটিকে পুনরায় কর্মক্ষম করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি কেন?
এসব তথ্য প্রকাশ হলে বোঝা যাবে, লোকোমোটিভগুলো সত্যিই অর্থনৈতিকভাবে অচল হয়ে গেছে, নাকি ব্যবস্থাপনার অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণ ঘাটতির কারণে মূল্যবান সরকারি সম্পদ কর্মক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
জনগণের সম্পদের জবাবদিহি কোথায়?:-
রেলের প্রতিটি লোকোমোটিভ জনগণের অর্থে কেনা সরকারি সম্পদ। ফলে একটি ইঞ্জিন দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকা কেবল যান্ত্রিক সমস্যা নয়; এটি সরকারি সম্পদের ব্যবহার ও সংরক্ষণের প্রশ্ন।
রেলের নিজস্ব নথিতেই যখন লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, ওভারহলিং এবং কর্মক্ষম রাখার জন্য পৃথক দায়িত্ব ও অবকাঠামো নির্ধারিত রয়েছে, তখন মেরামতযোগ্য ইঞ্জিনকে দীর্ঘদিন পরিষেবার বাইরে রাখার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধু অবহেলা নয়—এতে রেলের পরিবহন সক্ষমতা কমার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও তৈরি হয়। আর অভিযোগ সত্য না হলে রেলওয়ের উচিত কারিগরি প্রতিবেদন প্রকাশ করে স্পষ্ট করা—কেন সংশ্লিষ্ট লোকোমোটিভগুলোকে পরিষেবা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং কেন সেগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব নয়।
কারণ, নতুন লোকোমোটিভ কেনার পাশাপাশি পুরোনো সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হতে পারে রেলের অর্থ সাশ্রয়, পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসম্পদের সুরক্ষার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।