রেলের উন্নয়নে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার মেগা পরিকল্পনা

Mega plan of 1 lakh 9 thousand crore taka
আবুল কালাম আজাদ(বিশেষ প্রতিবেদক) : ১৯ জুলাই ২০২৬ ০১:৪৮ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ(বিশেষ প্রতিবেদক) : ১৯ জুলাই ২০২৬ ০১:৪৮ অপরাহ্ন
রেলের উন্নয়নে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার মেগা পরিকল্পনা
রেলের উন্নয়নে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার মেগা পরিকল্পনা

বিগত দেড় দশকে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হলেও রেলের উন্নয়ন বা  রেলের গতি বাড়েনি। এখনও অনেকটাই খুঁড়িয়ে চলছে রেল। আওয়ামী  সরকারের সময় বেশকিছু নতুন লাইন করা হলেও তা বেশির ভাগেরই ব্যবহার সীমিত।  অন্যদিকে রেলের প্রায় ৬৩ শতাংশ ইঞ্জিনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও শক্তিশালী করতে মেগা উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বর্তমান বিএনপি সরকার।

এরই অংশ হিসেবে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার ১৪টি মেগাপ্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকার জোগান দেবে ৩৬ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ সহায়তা দরকার হবে ৭২ হাজার ৪১৮ কোটি টাকার। এজন্য বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে এরই মধ্যে যোগাযোগ শুরু করা হয়েছে।

বৈদেশিক ঋণের বড় অংশই ৫৪ হাজার কোটি টাকা দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি)। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়ন থাকবে ১০ হাজার কোটি টাকা। চীনের থেকেও প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। আগামী ১০ বছরে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে রেলওয়ে। পরিকল্পনা কমিশন ও বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলের  উন্নয়নে নতুন ইঞ্জিন ও কোচ কেনা থেকে শুরু করে বিদ্যমান রেলপথকে উন্নত মানের ডুয়েল গেজে রূপান্তর এবং বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বেশকিছু প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে, বাকিগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে ঋণ চাওয়া হবে। সেই লক্ষে বিভিন্ন ধাপে কাজ চলমান রয়েছে। 

জানা গেছে, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের যাত্রাপথের দূরত্ব কমাতে ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা বহু বছর ধরে চলছে। বিগত সরকারের সময় এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল। বিএনপি সরকার এটি নির্মাণ শুরুর জন্য জমি অধিগ্রহণ শুরু করতে চাচ্ছে। সঙ্গে পরিষেবা স্থানান্তরের কাজও করা হবে। এতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন থাকবে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং এডিবির ঋণ থাকবে ৮ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা। চলতি বছর শুরু করে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরো রেলপথকে ব্রডগেজ করার অংশ হিসেবে লাকসাম থেকে চিনকি আস্তানা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত মিটারগ্রেজ ট্র্যাককে ডুয়েলগেজ ডাবল ট্র্যাক রূপান্তরের প্রকল্পও রয়েছে সরকারের পরিকল্পনা। এজন্য ১৮ হাজার ৭২১ কোটি ৯৯ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের ২ হজার ৮২৭ কোটি এবং এডিবি ও ইআইবির ঋণ রয়েছে ১৫ হাজার ৮৯৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩২ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।

পাশাপাশি বিদ্যমান ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট ব্রডগেজ করার অংশ হিসেবে টঙ্গী-ভৈরববাজার-আখাউড়া সেকশনের বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তর করা হবে। এজন্য ১৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ২৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা সরকারের এবং  ১২ হাজার ৩৪১ কোটি টাকার ঋণ দেবে এডিবি। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে  ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।    

 প্রকল্পের সূত্রমতে, বিদ্যমান ইঞ্জিনগুলোর মেয়াদ ফুরিয়ে আসায় রেলের জন্য ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহে ২ হাজার ৮২৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের অর্থায়ন ৮২৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ও এআইআইবির ঋণ থাকবে ১ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। চলতি বছর জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার কথা রয়েছে।

এছাড়া ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত বর্তমান রুটটিতে বিদ্যুৎচালিত ট্রেন প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য ৪ হাজার ২৮২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে সরকার দেবে ১ হাজার ৪৫২ কোটি এবং এডিবির ঋণ থাকবে ২ হাজার ৮৩০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০৩৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

যাত্রীসেবা ও মালামাল পরিবহনে গতি আনতে জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনের সমান্তরালে ৫ হাজার ৭২৯ কোটি ২ লাখ টাকা ব্যয়ে ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৪৫ কোটি সরকারের এবং ৪ হাজার ৫৮৩ কোটি ২২ লাখ টাকার সরবরাহকারী ঋণ (সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট) রয়েছে। ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। 

সূত্র বলছে, রেলওয়ের জন্য ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহে ২ হাজার ২৩৭ কোটি ২৮ লাখ টাকার প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়া ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) থেকে ঋণ দেবে ১ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। সরকারের অর্থায়ন থাকবে ৪৮৬ কোটি টাকা। ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া রেলওয়ের ৬০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহে ব্যয় হবে ৮ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইডিসিএফের ঋণ থাকছে ৫ হাজার ৬৬৬ কোটি এবং সরকারের অর্থায়ন ২ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা। ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এর বাইরে ২০০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ, রিলিফ ক্রেন এবং আন্ডার ফ্লোর হুইল লেদ মেশিন সংগ্রহে  ৩ হাজার ২৮১ কোটি টাকার মধ্যে এডিবি দেবে ২ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটিতে সরকারের অর্থায়ন থাকবে ৯১৫ কোটি টাক। ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। 

এছাড়া রেলওয়ের কারিগরি সক্ষমতা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে পার্বতীপুরের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা স্থাপনে ২ হাজার ৯৬০ কোটি টাকার মধ্যে এডিবি এবং এআইআইবি ঋণ দেবে ২ হাজার ৩১৮ কোটি। সরকারের জোগান থাকবে ৬৪১ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে। এছাড়া ২০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক  লোকোমোটিভ সংগ্রহে ব্যয় হবে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি, এর মধ্যে চীনের সহায়তা থাকবে ১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। সরকারের জোগান থাকবে মাত্র ৪৪ কোটি টাকা। আগামী দুই বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

সূত্রমতে, ৪৬টি ব্রডগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ প্রকল্পটি ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে। এজন্য মোট ব্যয় ৩ হাজার ৮৯১ কোটি টাকার মধ্যে ইডিসিএফের ঋণ থাকবে ২ হাজার ৬৫৯ কোটি এবং সরকার দেবে ১ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। সৈয়দপুর রেলওয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ৪ হাজার ২১০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। এর মধ্যে এডিবি’র ঋণ ৩ হাজার ৩১৪ কোটি এবং সরকারের জোগান থাকবে ৮৯৬ কোটি টাকা। রাজবাড়ীতে নতুন ক্যারেজ ও ওয়াগন রক্ষণাবেক্ষণে ৮ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প চলতি বছর জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে।   

 প্রকল্পগুলোর সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, বেশ কয়েকটা প্রকল্পের ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। আবার কিছু প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে ডিপিপি প্রণয়ণের কাজ চলছে। প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে কাজ এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে কথা চলছে। 

যদিও উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এখনই বিদ্যুৎচালিত ট্রেন বা অত্যন্ত দ্রুতগতির বুলেটের মতো ট্রেনের পেছনে না ছুটে বরং দ্বিমুখী রেলপথ নির্মাণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলে মত দেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান। 

 তিনি বলেন, রেল খাতকে যদি সেবা দেওয়ার পাশাপাশি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হয়। তবে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। পণ্য পরিবহনের জন্য আলাদা বা বিশেষায়িত পথ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। কেরানীগঞ্জে প্রস্তাবিত কনটেইনার টার্মিনালের মতো প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ যথাযথ সক্ষমতা বৃদ্ধি না করলে বিশাল অংকের নতুন বিনিয়োগও ঝুঁকিতে পড়বে।

হাদিউজ্জামান বলেন, বিলাসী প্রকল্পগুলোর দিকে না তাকিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ এবং যুগোপযোগী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে জেলায় নতুন রেল সম্প্রসারণের আগে বর্তমান রেলপথের সংস্কার, ইঞ্জিন ও বগির সংকট দূর করা এবং প্রতিটি বন্দরের সঙ্গে রেলের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা উচিত। সড়ক ও রেলপথের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমন্বিত পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। যেহেতু বর্তমান সরকারের বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থানে একজন মন্ত্রী তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন, তাই সড়ক ও রেলের সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া শুধুমাত্র নামকাওয়াস্তে প্রকল্প গ্রহণ করলে দেশের সম্পদের অপচয় হবে এবং উভয় যোগাযোগ মাধ্যমই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।