সেই সব বীরদের অজানা কথা

The unknown stories of all those heroes
ওয়ালিউর রহমান বাবু ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩০ অপরাহ্ন মতামত
ওয়ালিউর রহমান বাবু ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩০ অপরাহ্ন
সেই সব বীরদের অজানা কথা
শহিদ শামসুদ্দিন আহমেদ বুলু, শহিদ সেলিম (বেন্টু), শহিদ আব্দুল আজিজ, শহিদ হারু পেন্টার, শহিদ কসিমুদ্দীন রতন।

অসহযোগ আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজশাহী জেলা সদরের দরগাপাড়া, পাশের পাড়া পাঠানপাড়া, হোসনীগঞ্জ এলাকার মানুষের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। এইসব এলাকার অন্য রকম বীরদের কথা অনেকের অজানা। রাজশাহী কলেজের প্রাক্তন ছাত্র, এক সময়ের শরীরচর্চাবিদ, মিস্টার রাজশাহী মুসা মাসুদের দেয়া তথ্যে তাদের জীবন উৎসর্গের কথা জানা যায়। বিশেষ করে প্রজন্মের কাছে তাদের বীরত্বের কথা কোনোদিন কেউ বলেন না। স্বাধীনতাকামী প্রতিরোধযোদ্ধা ও এসব এলাকার সাধারণ মানুষকে খাদ্য সংকট থেকে রক্ষায় মুরুব্বি ও অন্যান্যরা চিন্তাভাবনা ও আলোচনা করে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারলেন না। সকলের আলোচনা ও পরামর্শে সিদ্ধান্ত হল রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের উত্তরে শিরইল কলনী খাদ্য গুদামে চাল গম মজুদ আছে। সেখান থেকে এগুলি সংগ্রহ করা যেতে পারে। কিন্তু গুদামটি অবাঙালি এলাকায় হওযায় এ নিয়ে সবার মধ্যে আরেক ভাবনার সৃষ্টি হল। রাজশাহীর তৎকালীন পৌরসভার অক্ট্রো ইন্সপেক্টর পাঠানপাড়ার শামসুদ্দিন আহমেদ বুলু, রাজশাহী পৌরসভার ট্রাক ড্রাইভার আমাদের দরগাপাড়ার সেলিম (বেন্টু), পৌরসভার ট্রাক ড্রাইভার আব্দুল আজিজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তৎকালীন ওয়ার্ড বয় দরগাপাড়ার মোহাম্মদ, দরগাপাড়ার দিনমজুর চান্দু শেখ, পাঠানপাড়ার হারু পেন্টার, ভবঘুরে গামা, তৎকালীন রাজশাহী পৌরসভার ট্রাক ড্রাইভার হোসনীগঞ্জের খায়ের, ওয়াপদার স্টাফ কসিমুদ্দীন রতন সেখানে যাবার কথা জানিয়ে বলেন তারা প্রস্তুত। তাদের সাহসিকতায় সকলে চিন্তা করতে থাকেন তাদেরকে এই অবাঙালি এলাকায় পাঠানো যাবে কিনা। কিন্তু তারা তাদের চিন্তাভাবনা করতে না দিয়ে বললেন তারা যাবেই, তারা প্রস্তুত। অনেকে তাদের ঝুঁকি না নেয়ার পরামর্শ দিলে তারা অনড়, বলেন চাল গম নিয়ে তখনই ফিরে আসবেন। 

৬ এপ্রিল পৌরসভার ট্রাক আনা হলে তারা সকলের থেকে দোআ নিয়ে ট্রাকে উঠেন।এ সময় তাদের সাথে আরো দুই একজন যেতে চাইলে তারা তাদের না নিয়ে এলাকাতেই অপেক্ষা করতে বলেন। বাড়িতে থাকা শিশু, নারী, বয়স্করা দোআ করতে থাকেন। সেই বীরেরা সেখান থেকে চাল, গম নিয়ে আসার পর সকলের অনুরোধে আবার সেখানে গেলেন। সময় পার হতে থাকলে উৎকন্ঠা সৃষ্টি হল। পরের দিন তার পরের দিনও একইভাবে কেটে গেল। কিন্তু তারা ফিরলেন না অথচ এ সময় রাজশাহী জেলা সদর সহ আশেপাশেরর অঞ্চল স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রনে। জানা যায়, গুদাম এলাকার স্বাধীনতা বিরোধী অবাঙালিরা শফি নামে এক প্রভাবশালী অবাঙালির সহযোগিতায় তাদেরকে হত্যা করে। জানা যায়, অবাঙালিরা তাদের ঘেরাও করে পাকিস্তানী সৈন্যদের কাছে তুলে দেয়। অনেকে বলেন যায়, তাদেরকে বেঁধে নির্যাতন করে হত্যা করার সময় তারা পানি পানি করে চিৎকার করতে থাকেন। এরপর তাদের হত্যা করে একটি গর্তে পুতে দেয়া হয়। শোনা যায় ট্রাকসহ তাদের উধাও করে দেয়া হয়। তবে এ নিয়ে কেউ সঠিক ভাবে মুখ খুলেননি। স্বাধীনতার এত বছর পরেও দেশপ্রেম মানবপ্রেমের এই বীর শহিদদের কথা আজও অনেকের কাছে অজানা। তাদের কথা হাজারও কথার মাঝে চাপা পড়ে গেছে। তাদের কথা সেভাবে কোথাও লেখা হয়নি, কোনো আয়োজনেও তাদের কথা বলা হয় না, হয়তো তারা অতি সাধারণ ছিল তাই। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধ ছিল সার্বজনীন, গণ যুদ্ধ । সেই বীর শহিদদের পরিবারও তাদের এ কথা কখনো কাউকে সেভাবে বলেনি। মুসা মাসুদের মতো যারা এই বীরদের কথা জানেন তারাই তাদের দীর্ঘশ্বাসে ভাবতে ভাবতে ফিরে যান সেইদিনের স্মৃতিতে।

তথ্যসূত্র ঃ মুসা মাসুদ, প্রাক্তন শরীরচর্চাবিদ ও প্রাক্তন মিস্টার রাজশাহী

লেখকঃ তথ্য সংগ্রাহক, সমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মী,রাজশাহী