চন্দ্রকলা-শনির গ্রহ, এ মাসে আরও যা যা দেখবেন
রাতের আকাশ বড়ই বিচিত্র। অনেকে দেখেন শুধু অন্ধকার, অনেকের চোখে পড়ে তারার মিটিমিটি জ্বলে থাকা। কিন্তু রাতের আকাশে শুধু চাঁদ-তারাই থাকে না। আরও অনেক রহস্য রয়েছে। যা খালি চোখে অনেক সময় দেখা যায় না। তবে এ মাসের শেষে অর্থাৎ অক্টোবরের শেষভাগে বাংলাদেশের রাতের আকাশে চোখ রাখলে মিলতে পারে বেশ কিছু আকর্ষণীয় মহাজাগতিক দৃশ্যের দেখা।
ওরিওনিড উল্কাবৃষ্টি, উজ্জ্বল শুক্র ও শনি গ্রহ, চাঁদের সঙ্গে গ্রহের অবস্থান এবং দূরবর্তী নক্ষত্রমণ্ডল সব মিলিয়ে মহাকাশপ্রেমীদের জন্য এই সময়টি হতে পারে বিশেষ আকর্ষণের। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এবং শহরের আলোকদূষণ থেকে দূরে যেতে পারলে এসব দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ আরও বাড়বে।
ওরিওনিড উল্কাবৃষ্টির অপেক্ষা
অক্টোবরের রাতের আকাশের অন্যতম আকর্ষণ ওরিওনিড উল্কাবৃষ্টি। হ্যালির ধূমকেতু সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার পথে মহাকাশে যে ধূলিকণা ও ক্ষুদ্র কণার রেখা রেখে যায়, পৃথিবী সেই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করা কণাগুলো জ্বলে উঠে উল্কার সৃষ্টি করে।
প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয়ার্ধে সক্রিয় থাকা এই উল্কাবৃষ্টি ২১ থেকে ২২ অক্টোবরের দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা। অনুকূল পরিস্থিতিতে ঘণ্টায় প্রায় ১৫ থেকে ২০টি উল্কা দেখা যেতে পারে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আকাশের অবস্থা ও পর্যবেক্ষণের স্থানের ওপর নির্ভর করে।
উল্কাবৃষ্টি দেখার জন্য টেলিস্কোপের প্রয়োজন নেই। খোলা জায়গায় গিয়ে চোখকে অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করা ভালো। রাতের গভীর ভাগ থেকে ভোরের আগে পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলে ভালো ফল মিলতে পারে। তবে মেঘলা আকাশ, কুয়াশা ও কৃত্রিম আলোর কারণে দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে।
সন্ধ্যার আকাশে শনির গ্রহ
অক্টোবরের শেষভাগেও শনিকে রাতের আকাশে খুঁজে দেখার সুযোগ থাকবে। সূর্যাস্তের পর দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে এর অবস্থান খেয়াল করা যেতে পারে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রহটির অবস্থান আকাশে পরিবর্তিত হবে। শনি সাধারণত স্থির, হালকা হলুদাভ আলোর বিন্দুর মতো দেখায়। নক্ষত্রের তুলনায় এর আলো কম ঝিকমিক করতে পারে। তবে খালি চোখে গ্রহটিকে চেনা গেলেও এর বিখ্যাত বলয় দেখতে বাইনোকুলারের চেয়ে উপযুক্ত বিবর্ধনক্ষমতার টেলিস্কোপ বেশি কার্যকর। ভালো মানের টেলিস্কোপে শনির বলয়ের পাশাপাশি এর বৃহত্তম উপগ্রহ টাইটানও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।
পশ্চিম আকাশে ঝলমল করবে শুক্র
সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে শুক্র গ্রহের অবস্থানও নজর কাড়তে পারে। সৌরজগতের সবচেয়ে উজ্জ্বল গ্রহ হওয়ায় গোধূলির আলো কমে এলে একে সহজেই চেনা যায়। অনেক সময় দূর থেকে শুক্রকে উজ্জ্বল নক্ষত্র বলে ভুল হতে পারে, যদিও এটি আসলে একটি গ্রহ।
অক্টোবরের শেষভাগে সূর্যাস্তের পর পশ্চিম থেকে পশ্চিম-দক্ষিণপশ্চিম আকাশে শুক্রকে খুঁজে দেখা যেতে পারে। তবে কতক্ষণ এটি দিগন্তের ওপরে থাকবে, তা নির্দিষ্ট দিনের অবস্থান ও স্থানীয় দিগন্তের ওপর নির্ভর করবে। শুক্র পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন নেই; খালি চোখেই দেখা সম্ভব।
এদিকে বৃহস্পতিও রাতের আকাশের আকর্ষণ হতে পারে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব আকাশে এর উদয় লক্ষ্য করা যেতে পারে। উজ্জ্বলতার কারণে পরিষ্কার আকাশে বৃহস্পতিকে শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ।
চন্দ্রকলা দেখতে পারবেন
অক্টোবরের শেষভাগে চাঁদের অবস্থানেও আসবে পরিবর্তন। যাবে বলা হয় চন্দ্রকলা। চাঁদের কলা প্রতিদিন বদলানোর ফলে রাতের আকাশে এর উজ্জ্বলতা ও দৃশ্যমানতার সময়ও পরিবর্তিত হবে। মাসের শেষদিকে পূর্ণিমার কাছাকাছি সময়ে চাঁদের আলো বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
২৪ অক্টোবরের দিকে চাঁদ ও শনিকে আকাশে কাছাকাছি অবস্থানে দেখা যেতে পারে। এ ধরনের দৃশ্যকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় গ্রহ ও চাঁদের আপাত নৈকট্য বলা হয়। পৃথিবী থেকে দেখলে তাদের কাছাকাছি মনে হলেও বাস্তবে তাদের মধ্যে দূরত্ব বিপুল।
পূর্ণিমার সময় চাঁদের উজ্জ্বল আলো রাতের আকাশকে আলোকিত করে তুলবে। তবে এই আলো উল্কাবৃষ্টি বা আবছা ছায়াপথ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে কিছুটা অসুবিধা তৈরি করতে পারে। তাই উল্কাবৃষ্টি দেখার পরিকল্পনা থাকলে চাঁদের আলো কম থাকে এমন সময় বেছে নেওয়া ভালো।
অক্টোবরের শেষভাগে রাতের আকাশে কয়েকটি পরিচিত নক্ষত্রমণ্ডলও পর্যবেক্ষণ করা যায়। এর মধ্যে পেগাসাস ও ক্যাসিওপিয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পূর্ব আকাশের দিকে তাকালে পেগাসাস নক্ষত্রমণ্ডলের চারটি উজ্জ্বল নক্ষত্র দিয়ে তৈরি প্রায় চারকোনা আকৃতি চোখে পড়তে পারে। এই বিন্যাসকে ‘গ্রেট স্কয়ার অব পেগাসাস’ বলা হয়। নক্ষত্র চেনার প্রাথমিক অভ্যাস গড়ে তুলতে এটি সহায়ক।
অন্যদিকে উত্তর আকাশে ক্যাসিওপিয়া নক্ষত্রমণ্ডলের পাঁচটি প্রধান নক্ষত্র ইংরেজি ‘ডব্লিউ’ বা ‘এম’-এর মতো আকৃতি তৈরি করে। আকাশে এর অবস্থান পর্যবেক্ষণের সময় ও দিক অনুসারে বদলাতে পারে।
এছাড়া অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি দেখারও চেষ্টা করা যেতে পারে। এটি পৃথিবী থেকে বহু দূরে অবস্থিত একটি ছায়াপথ। পরিষ্কার, অন্ধকার আকাশে খালি চোখে আবছা আলোর দাগের মতো দেখা যেতে পারে; তবে বাইনোকুলার ব্যবহার করলে শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হয়। পূর্ণিমার উজ্জ্বল আলো ও শহরের আলোকদূষণ এ ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
মনে রাখবেন: আকাশের এসব দৃশ্যের সঠিক সময় ও দৃশ্যমানতা নির্দিষ্ট তারিখ, বাংলাদেশের অবস্থান, আবহাওয়া এবং দিগন্তের বাধার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে পূর্ণিমার তারিখ, গ্রহের অবস্থান এবং উল্কাবৃষ্টির সর্বোচ্চ সময় প্রকাশের আগে নির্ভরযোগ্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ক্যালেন্ডার বা পর্যবেক্ষণ-অ্যাপ দিয়ে যাচাই করে নেওয়া উচিত।
সূত্র: অ্যাস্ট্রোনমি ডটকম, সাইটেক, স্কাইম্যাপ