দেশে হামের ভয়াবহ তাণ্ডব: দেশে মৃত্যু প্রায় ১২০০, উপসর্গযুক্ত রোগী ছাড়াল ২ লাখ ১৩ হাজার
দেশে চলমান হাম (Measles) মহামারি মারাত্মক ও উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাখালীস্থ নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সর্বশেষ ডেঙ্গু ও হাম সংক্রান্ত সমন্বিত পরিস্থিতি বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে হাম ও এর তীব্র উপসর্গ নিয়ে মোট ১,১৯৬ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হামজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে ১০৪ জনের এবং হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরও ১,০৯২ জন।
একই সময়ে সারাদেশে ২ লাখ ১৩ হাজার ২৪৪ জন রোগীর শরীরে হামের বিভিন্ন শারীরিক লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা দিয়েছে। উপসর্গযুক্ত আক্রান্তদের মধ্য থেকে সংগৃহীত নমুনা ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে মোট ২৩ হাজার ১২২ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম রোগ শনাক্ত করা হয়েছে।
বিভাগ ও জেলাওয়ারি মৃত্যুর চিত্র:
শীর্ষে ঢাকা ও সিলেট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জেলা ও বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা ও সিলেট বিভাগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। ঘনবসতি, বস্তি এলাকা এবং দুর্গম অঞ্চলের শিশুদের মধ্যে টিকাদানের হার কম থাকা ও সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারাই এ মৃত্যুর প্রধান কারণ বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
ঢাকা বিভাগ:-ঢাকা মহানগরের ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল ও মিরপুর বস্তি সংলগ্ন এলাকা। এছাড়া গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ ও ফরিদপুরে সংক্রমণ তীব্র। মৃত্যু ৪৯১ জন।
সিলেট বিভাগ :-
মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের দুর্গম হাওর এলাকা। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চিকিৎসায় বিলম্ব।মৃত্যুর সংখ্যা ১৯২ জন।
চট্টগ্রাম বিভাগ :-
চট্টগ্রাম মহানগরী, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও পার্শ্ববর্তী পার্বত্য জেলাসমূহ।মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ জন।
রাজশাহী বিভাগ :-
পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও রাজশাহী জেলা।মৃত্যুর সংখ্যা ৯৩ জন।
ময়মনসিংহ বিভাগ :-
নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা।মৃত্যুর সংখ্যা ৮৪ জন।
বরিশাল বিভাগ :-
ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনার উপকূলীয় ও চরাঞ্চল।মৃত্যুর সংখ্যা ৬৫ জন।
খুলনা বিভাগ :-
যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলা।মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ জন।
রংপুর বিভাগ :-
সার্বিক প্রাদুর্ভাব কিছুটা কম হলেও গ্রামীণ জনপদে সংক্রমণ অব্যাহত।মৃত্যুর সংখ্যা ১৭ জন।
মাস ও তারিখওয়ারি প্রাদুর্ভাবের গতিপ্রকৃতি (১৫ মার্চ – ১৮ অক্টোবর ২০২৬):
স্বাস্থ্য দপ্তরের উপাত্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে বিশেষ করে মার্চের মাঝামাঝি থেকে হামের প্রাদুর্ভাব ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে:
১৫ মার্চ – ৩০ এপ্রিল: প্রাদুর্ভাবের সূচনা পর্ব। প্রাথমিক পর্যায়ে সংক্রমণ ঢাকা ও নিকটবর্তী জেলাগুলোতে দেখা দেয়। ১ মে – ৩০ জুন: বর্ষার প্রারম্ভে দেশের ৮টি বিভাগেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল (IDH) সহ বিভাগীয় হাসপাতালগুলোতে শিশু শয্যা সংকট দেখা দেয়। ১ জুলাই – ৩১ আগস্ট: হামের তাণ্ডব চরম রূপ (Peak Period) নেয়। এ সময় দৈনিক গড়ে সহস্রাধিক উপসর্গযুক্ত রোগী চিহ্নিত হতে থাকে।
১ সেপ্টেম্বর – ১৮ অক্টোবর: বর্তমানেও সংক্রমণের ধারা উচ্চ সীমায় অবস্থান করছে। ১৮ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট ১ লাখ ৮৯ হাজার ৪৮৪ জন রোগীর মধ্যে ১ লাখ ৮১ হাজার ৭৫৬ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেলেও এখনো ৮ হাজারেরও বেশি রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্বাস্থ্য সংকট ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সতর্কবার্তা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল (UNICEF) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে হামে আক্রান্তদের প্রায় ৭৯ শতাংশই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে ৯ মাসের কম বয়সী শিশু (যাদের নিয়মিত এমআর টিকা নেওয়ার বয়স এখনো হয়নি) এবং রুটিন ইমিউনাইজেশন বা টিকা গ্রহণ না করা শিশুই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IEDCR) সাবেক ও বর্তমান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারি ও পরবর্তী সময়ে টিকাদান কর্মসূচিতে কিছুটা ঘাটতি থাকায় বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে (Zero-dose Children) রয়ে গিয়েছিল।
সরকারি উদ্যোগ ও পরামর্শ:
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন জোরদার করেছে। উপদ্রুত ৫৮টি জেলায় ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের সম্পূরক হাম-রুবেলা (MR) টিকা দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:
১. শিশুর শরীরে তীব্র জ্বর ও লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
২. শিশু সুস্থ মনে হলেও ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে নির্ধারিত দুটি এমআর (MR) টিকা সম্পূর্ণ করা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার ও পর্যাপ্ত তরল পান করা নিশ্চিত করা জরুরি।