অতিরিক্ত ঘুম ডেকে আনতে পারে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি
সুস্থ শরীর ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নেই। ঘুম শরীরের ক্লান্তি দূর করে, মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয় এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
তবে কম ঘুম যেমন স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে, তেমনি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ঘুমও হতে পারে উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামের অভাব থাকলে বাড়তে পারে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দীর্ঘ সময় ঘুমানো ও শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকার সঙ্গে অকালমৃত্যুর ঝুঁকির সম্পর্ক উঠে এসেছে। গবেষণার ফল অনুযায়ী, যারা দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুমান এবং শারীরিকভাবে সক্রিয় নন, তাদের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে।
তবে গবেষণায় পাওয়া এ সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে অতিরিক্ত ঘুম সরাসরি অকালমৃত্যুর কারণ। দীর্ঘ ঘুমের পেছনে থাকা অসুস্থতা, ঘুমের মান এবং জীবনযাপনের ধরনও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
অতিরিক্ত ঘুমের সঙ্গে অলসতার যোগসূত্র
ঘুমের প্রয়োজন ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। বয়স, শারীরিক অবস্থা, দৈনন্দিন পরিশ্রম ও ঘুমের মানের ওপর এর চাহিদা নির্ভর করে। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে কেউ নিয়মিত দীর্ঘ সময় ঘুমিয়েও ক্লান্ত বোধ করলে কিংবা দিনের বেলায় অতিরিক্ত তন্দ্রায় ভুগলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
দীর্ঘ সময় ঘুমানো এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা একসঙ্গে থাকলে হৃদ্রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও স্থূলতার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে। এসব অসংক্রামক রোগ বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম এবং সক্রিয় জীবনযাপন এসব রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
অতিরিক্ত ঘুমে যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে
১. বিষণ্নতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা
অতিরিক্ত ঘুম ও বিষণ্নতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ঘুমানোর অভ্যাস বিষণ্নতার কিছু লক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। আবার বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক অবসাদের কারণেও কারও ঘুমের সময় বেড়ে যেতে পারে। তাই অতিরিক্ত ঘুমকে এককভাবে মানসিক সমস্যার কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
২. কর্মক্ষমতা ও মনোযোগ কমে যাওয়া
দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পরও কারও কারও ক্লান্তি, ঝিমুনি ও কাজে অনীহা থাকতে পারে। এর ফলে দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ ধরে রাখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কর্মদক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ঘুমের মান ভালো না হলে দীর্ঘ সময় বিছানায় থেকেও শরীর সতেজ নাও লাগতে পারে।
৩. ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতার ঝুঁকি
অতিরিক্ত ঘুমের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে কিছু গবেষণায়। দীর্ঘ সময় ঘুমানো বা বিছানায় থাকার কারণে দৈহিক কর্মকাণ্ড কমে যেতে পারে। পাশাপাশি অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাও ওজন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। তবে শুধু বেশি ঘুমালেই ওজন বাড়বে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
৪. হৃদ্রোগের ঝুঁকি
দীর্ঘ সময় ঘুমানোর অভ্যাসের সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা রয়েছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত নয় ঘণ্টার বেশি ঘুমানো ব্যক্তিদের মধ্যে হৃদ্রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে এ সম্পর্কের পেছনে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, ঘুমের সমস্যা কিংবা আগে থেকে থাকা অসুস্থতার মতো কারণও থাকতে পারে।
৫. অকালমৃত্যুর আশঙ্কা
বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দীর্ঘ সময় ঘুমানোর সঙ্গে অকালমৃত্যুর ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিছু গবেষণায় বিপুলসংখ্যক মানুষের ঘুমের অভ্যাস ও স্বাস্থ্যগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের গবেষণা থেকে শুধু অতিরিক্ত ঘুমই মৃত্যুর কারণ—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। দীর্ঘ ঘুম অনেক সময় শরীরের ভেতরে থাকা অসুস্থতা বা অন্য স্বাস্থ্যগত সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।
কতক্ষণ ঘুমানো স্বাস্থ্যকর?
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণভাবে প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম উপযোগী বলে বিবেচিত হয়। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী এ চাহিদায় পার্থক্য হতে পারে। অসুস্থতা, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম কিংবা ঘুমের ঘাটতি পূরণের জন্য কখনো কখনো বেশি ঘুমের প্রয়োজনও হতে পারে।
কেউ যদি নিয়মিত ৯ থেকে ১০ ঘণ্টার বেশি ঘুমান, তারপরও ক্লান্তি অনুভব করেন অথবা দিনের বেলায় ঘুম পায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। থাইরয়েডের সমস্যা, ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা, বিষণ্নতা কিংবা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এর পেছনে থাকতে পারে।
সুস্থ থাকতে যা করবেন
সুস্থ থাকতে ঘুমের সময়ের পাশাপাশি ঘুমের মান এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও জেগে ওঠার অভ্যাস করুন। নিয়মিত হাঁটুন বা শরীরচর্চা করুন। সুষম খাবার গ্রহণ করুন এবং ঘুমের আগে অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের অভ্যাস কমিয়ে আনুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং দিনের বেলায় সক্রিয় থাকা। অতিরিক্ত ঘুমকে অবহেলা না করে এর কারণ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কারণ, সুস্থ থাকার জন্য যেমন ঘুম জরুরি, তেমনি জরুরি নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন।