পলিথিনে বন্ধ নগরীর ড্রেন, সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা ॥ নাগরিক অসচেতনতায় বাড়ছে ভোগান্তি

City drains blocked with polythene, waterlogging even with a little rain
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী :- ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:২০ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী :- ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:২০ অপরাহ্ন
পলিথিনে বন্ধ নগরীর ড্রেন, সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা ॥  নাগরিক অসচেতনতায় বাড়ছে ভোগান্তি
ছবি - বিজয় বাংলা

রাজশাহী মহানগরীতে জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে ড্রেন ও নর্দমায় যত্রতত্র ফেলা পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট ও গৃহস্থালির বর্জ্য। 

সামান্য বৃষ্টিতেই এসব বর্জ্যে আটকে থাকা ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে সড়ক, ফুটপাত ও বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়ছে নোংরা পানি। এতে করে একদিকে বাড়ছে নগরবাসীর দুর্ভোগ , তৈরি হচ্ছে দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণ।অন্যদিকে বাড়ছে রোগবালায়ের ঝুঁকি।

রাজশাহী মহানগরীর হেতেমখাঁ, শিরোইল কলোনি, উপশহর, সাহেববাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ড্রেনের মুখ, ফুটপাত ও সড়কের পাশে পড়ে আছে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের খালি প্যাকেটসহ নানা ধরনের বর্জ্য। কোথাও এসব বর্জ্য ড্রেনের মুখ আটকে রেখেছে, আবার কোথাও ড্রেনের ভেতরে স্তূপ হয়ে পানি চলাচলের পথ সংকুচিত করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক এলাকায় ড্রেন উপচে দুর্গন্ধযুক্ত পানি সড়ক ও অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও পানি বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নষ্ট করছে। দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় পচা খাবার ও অন্যান্য বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

হেতেমখাঁ এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী মিতা বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টি হলেই ড্রেনের পানি উপচে আমাদের এলাকায় ঢুকে যায়। অনেক সময় বাড়ির ভেতরেও পানি চলে আসে। এতে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে।’

স্থানীয়রা জানান, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অনেকে বাসাবাড়ির ময়লা ড্রেনে ফেলে দেন। আবার কেউ কেউ বারান্দা কিংবা বাসার সামনে থেকে পলিথিনে মোড়ানো বর্জ্য রাস্তায় ছুড়ে ফেলেন। পরে বৃষ্টির পানির সঙ্গে এসব বর্জ্য ড্রেনে গিয়ে জমা হয়। ফলে ধীরে ধীরে ড্রেনের পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃস্টি হয়।


তবে নগর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিয়মিত ড্রেন ও নর্দমা পরিষ্কার করা হলেও বর্জ্য ফেলার প্রবণতা বন্ধ না হওয়ায় স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) পরিচ্ছন্নতাকর্মী কামাল বলেন, ‘মানুষ দিন শেষে বাসার ময়লা ও বেঁচে যাওয়া খাবার ড্রেনে ফেলে দেয়। আমাদের সেগুলো হাত দিয়ে বের করতে হয়। অনেক সময় শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের লোকজনও ড্রেনে ময়লা ফেলেন।’

পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা জানান, ড্রেন পরিষ্কারের সময় বিপুল পরিমাণ পলিথিন ও প্লাস্টিকের বর্জ্য বের করতে হয়। এসব বর্জ্য সরাতে গিয়ে তাদের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। নিয়মিত পরিষ্কারের পরও কয়েক দিনের মধ্যে একই স্থানে আবার পলিথিন ও প্লাস্টিক জমে যায়।

শিরোইল কলোনির বাসিন্দা জামান আহমেদ বলেন, ‘আমাদের বাসার সামনের সড়ক সামান্য বৃষ্টিতেই পানিতে ডুবে যায়। বিশ্ব গোডাউনের মোড়ের আশপাশে প্রায় সারা বছরই ড্রেনের পানি জমে থাকে। যার কারনে মুসল্লিরা নোংরা পানি মাড়িয়ে মসজিদে যেতে বাধ্য হন। 

বিষয়টি ওয়ার্ডের দায়িত্বশীলদের জানালে তারা পরিষ্কার করে দেন। কিন্তু দু-এক দিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।’

উপশহরের বাসিন্দা আক্তার  হোসেন বলেন, ‘মানুষ এতটাই অসচেতন যে ড্রেনের কিছু অংশ ভেঙেও সেখানে ময়লা ফেলছে। এতে পানি নিষ্কাশনের পথ আরও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যারা পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল ড্রেনে ফেলছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। নাগর বাসিদের সচেতনতা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’



সাহেববাজারের ব্যবসায়ী সাইদুল  বলেন, ‘একটু বৃষ্টি হলেই ড্রেনের পানি রাস্তায় উঠে আসে। তখন পলিথিন, চিপসের প্যাকেট ও প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী পানিতে ভাসতে দেখা যায়। ড্রেন পরিষ্কার করার সময় এসব বর্জ্যই বেশি পাওয়া যায়। রাস্তার পাশের দোকান ও বসতি থেকেও প্রতিদিন বর্জ্য ফেলা হয়।’

নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাত ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও রাস্তার পাশে গৃহস্থালির বর্জ্যের স্তূপ, কোথাও আবার ড্রেনের মুখে আটকে আছে পলিথিন ও প্লাস্টিকের প্যাকেট। ডাস্টবিন বা নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার সুযোগ থাকলেও অনেকেই তা অনুসরণ করছেন না। ফলে বর্জ্য বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনে ঢুকে পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা অকার্যকর করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিন সহজে পচে না। ফলে এগুলো দীর্ঘদিন পরিবেশে থেকে যায় এবং বৃষ্টির পানির সঙ্গে ভেসে ড্রেনের সরু মুখ, সংযোগস্থল ও পানিপ্রবাহের পথে আটকে যায়। এতে ড্রেনের পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ক্ষমতা কমে গিয়ে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘসময় জমে থাকা ময়লা পানিতে রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকে।

রাসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন বলেন, ‘আমাদের নিয়োমিত ড্রেনের ময়লা পরিষ্কারের কাজ চলছে। এ কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করছেন রাসিক প্রশাসক। বৃষ্টির সময় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। তবে এ সমস্যা কমাতে নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে। ড্রেনে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ কোনো ধরনের বর্জ্য না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে।’

নগরবাসীর অভিযোগ, শুধু নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বন্ধ, নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার অভ্যাস তৈরি, নিয়মিত নজরদারি এবং প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে নগরীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।