অডিট আপত্তি ঘিরে রেল মহাপরিচালককে ঘায়েলের চেষ্টা
পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের আপত্তির অধিকাংশই নিষ্পত্তির পথে । পাঁচ পিডির দায় এক ব্যক্তির ঘাড়ে চাপানোর অভিযোগ কেন বারবার উঠছে এনিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তবে কি কেউ নেপথ্য থেকে ডিজির পদটি বাগিয়ে নেয়ার জন্য "অডিট আপত্তি ঘিরে রেল মহাপরিচালককে ঘায়েলের চেষ্টা করছে ! এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে অডিট আপত্তিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালককে (ডিজি) সরকার ও জনমনে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে—এমন অভিযোগ উঠেছে রেলের অভ্যন্তরে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি অর্থব্যবস্থাপনায় অডিট একটি স্বাভাবিক ও বাধ্যতামূলক জবাবদিহির প্রক্রিয়া। ফলে অডিট আপত্তি উত্থাপিত হওয়া মানেই দুর্নীতি বা অর্থ আত্মসাতের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাব, নথিপত্র ও ব্যাখ্যা পর্যালোচনার মাধ্যমে আপত্তি নিষ্পত্তির সুযোগ থাকে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প ঘিরে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তির যে তথ্য বিভিন্ন আলোচনায় এসেছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশই এখন নিষ্পত্তি হয়েছে অথবা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আপত্তির পুরো অর্থকে সরাসরি অনিয়ম বা রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি হিসেবে উপস্থাপন করা তথ্যগতভাবে বিভ্রান্তিকর।
‘অডিট আপত্তি’ আর ‘দুর্নীতি’ এক নয়:-
সংশ্লিষ্টরা জানান, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের চুক্তিটি ছিল ইপিসি টার্নকি (EPC Turnkey) এবং লাম্পসাম (Lump Sum) ভিত্তিক। প্রকল্পটি জি-টু-জি (G2G) অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে প্রচলিত ঠিকাদারি প্রকল্পের সঙ্গে এ প্রকল্পের চুক্তির কাঠামো, দায়বদ্ধতা ও অর্থ পরিশোধের পদ্ধতিতে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে চুক্তির ধরন ও কারিগরি শর্তের ব্যাখ্যার ভিন্নতার কারণে বেশ কিছু অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র, ব্যাখ্যা ও চুক্তির শর্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে এসব আপত্তির অধিকাংশ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। অবশিষ্ট আপত্তিগুলোও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে সূত্রটির দাবি।
তবে অডিট আপত্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে সরাসরি দুর্নীতি হিসেবে উপস্থাপন করা কতটা যৌক্তিক—এ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন রেল খাতের সংশ্লিষ্টরা।
গুণগত মান যাচাইয়ে ছিল বিশেষজ্ঞ তদারকি:-
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের মতো বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণে কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পরামর্শক নিয়োগ করা হয়েছিল।
তাদের দাবি, কাজের পরিমাণ ও গুণগত মান যাচাই এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়নের পরই ঠিকাদারের বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এরপর প্রকল্প দপ্তরের মাধ্যমে হিসাব বিভাগের ভেটিং শেষে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চীনা দূতাবাসের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের কার্যক্রম এগিয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের দাবি, এতগুলো ধাপের যাচাই-বাছাই ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বিল পরিশোধ হওয়ায় একক কোনো ব্যক্তির পক্ষে ইচ্ছামতো অর্থ ছাড় বা অনিয়ম করার সুযোগ থাকার কথা নয়।
পাঁচ পিডির প্রকল্প, আলোচনায় কেন একজন?:-
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পটির নেতৃত্ব ও দায়বদ্ধতা নিয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের শুরু থেকে এ পর্যন্ত পাঁচজন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ সাম্প্রতিক বিভিন্ন আলোচনা ও প্রতিবেদনে একই বিষয়ে বারবার একজন কর্মকর্তার নাম সামনে আসছে।
এতে রেলের অভ্যন্তরে প্রশ্ন উঠেছে—একটি দীর্ঘমেয়াদি মেগা প্রকল্পে একাধিক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করে থাকলে প্রকল্পের পুরো সময়ের অডিট আপত্তির দায় কীভাবে একজন ব্যক্তির ওপর বর্তায়?
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বিষয়টিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক না করে প্রকল্পের চুক্তি, অনুমোদন, বিল পরিশোধ, অডিট আপত্তি এবং পরবর্তী নিষ্পত্তির পুরো প্রক্রিয়া বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
পদ পেতে প্রতিযোগিতা, নাকি অডিটই হাতিয়ার?:-
রেলের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র দাবি করেছে, মহাপরিচালকের পদ থেকে বর্তমান ডিজিকে সরিয়ে ওই পদে আসতে আগ্রহী একাধিক কর্মকর্তা সক্রিয় রয়েছেন। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে অডিট আপত্তি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে সূত্রটির দাবি।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে—শুধু অডিট আপত্তি থাকার ভিত্তিতে যদি একজন কর্মকর্তাকে অনিয়মকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে একই ধরনের আপত্তি থাকা অন্য কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও কি একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে?
রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির আগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রবণতা প্রশাসনিক ন্যায়বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
‘অডিট রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির অপরিহার্য ব্যবস্থা’:-
রেল বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থাপনায় অডিট একটি অপরিহার্য জবাবদিহির ব্যবস্থা। সরকারি অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, নকশা পরিবর্তন বা অতিরিক্ত ব্যয়ের যৌক্তিকতা রয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করতেই অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়।
এছাড়া অডিট আপত্তি মানেই দুর্নীতি—এমন ধারণা সঠিক নয়। অডিটে কোনো প্রশ্ন বা আপত্তি উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তার জবাব ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনার ভিত্তিতে আপত্তি নিষ্পত্তি বা বহাল থাকে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের অডিট আপত্তিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হলে, যাতে অডিটে উত্থাপিত অর্থের পরিমাণকেই রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ হিসেবে মনে হয়, তাহলে বিষয়টি বিভ্রান্তিকর বার্তা দিতে পারে।
“এই প্রবণতা শুধু একজন কর্মকর্তা বা একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, প্রশাসনিক ন্যায়বিচার এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জন্যও উদ্বেগের বিষয়।”
প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ নথি যাচাই:-
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প। ফলে এর অর্থব্যয়, চুক্তি বাস্তবায়ন, কাজের মান এবং অডিট—প্রতিটি বিষয়েই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো অডিট আপত্তি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়ার আগে সেটিকে দুর্নীতির চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন না করে সংশ্লিষ্ট নথি, অডিট পর্যবেক্ষণ, কর্তৃপক্ষের জবাব এবং নিষ্পত্তির বর্তমান অবস্থা একসঙ্গে বিবেচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের অডিট নিয়ে প্রকৃত চিত্র জানতে হলে কত টাকা নিয়ে আপত্তি উঠেছে—শুধু সেই অঙ্ক নয়; কতটি আপত্তি ছিল, কোনগুলো বৈধ হিসেবে বহাল রয়েছে, কতগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে, কতগুলো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় এবং কোন ক্ষেত্রে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি নিরূপিত হয়েছে—এসব তথ্যই জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তবেই অডিট আপত্তি, প্রকৃত অনিয়ম এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তিকে হেয় করার অভিযোগ—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা সম্ভব হবে।
প্রকৌশলী থেকে মহাপরিচালক—তিন দশকের পথচলা:-
অডিট আপত্তি নিয়ে বিতর্কের বাইরে বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেনের দীর্ঘ কর্মজীবনের দিকটিও সামনে আসে। রেলওয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেবল বর্তমান শীর্ষ নির্বাহীর পদে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৯৪ সালের ২৫ এপ্রিল বাংলাদেশ রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ১৩তম বিসিএসের রেলওয়ে প্রকৌশল ক্যাডারের এই কর্মকর্তা। মাঠপর্যায়ের প্রকৌশল দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তার কর্মজীবনে পরবর্তীতে রেলের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসন ও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যুক্ত হয়।
তার কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলোর একটি পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প। তিনি এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
অর্থাৎ রেলওয়ের একজন মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী হিসেবে যে কর্মজীবনের সূচনা, ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সেটিই তাকে দেশের রেলওয়ের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে নিয়ে এসেছে।
বর্তমানে রেলওয়ের সামনে যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, নিরাপদ ও সময়নিষ্ঠ ট্রেন পরিচালনা, অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানটিকে আরও সেবামুখী ও কার্যকর করার মতো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মহাপরিচালক হিসেবে তার দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে রেলের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমেও তার নেতৃত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে। এর মধ্যে ঢাকা-গোপালগঞ্জ নতুন ট্রেন সার্ভিস চালুর সময় মহাপরিচালক হিসেবে ট্রেনের যাত্রা ও সময়সূচি নিয়ে তার বক্তব্যও গণমাধ্যমে আসে।
রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন কর্মকর্তার মূল্যায়ন শুধু তার বর্তমান পদবি দিয়ে নয়; দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কী দায়িত্ব পালন করেছেন, কী ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানের কাজে কতটা প্রয়োগ করতে পারছেন—সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সেই বিবেচনায় মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী থেকে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক—আফজাল হোসেনের দীর্ঘ কর্মজীবনের পুরো পথচলাই রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতার একটি উদাহরণ।
তবে অডিট আপত্তি নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নথি, অডিট পর্যবেক্ষণ, কর্তৃপক্ষের জবাব এবং আপত্তি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ার ওপর। ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিতর্কের পরিবর্তে এসব নথি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হওয়া সম্ভব।