মানা হয়নি অডিট নিয়োম ॥ রাকসুর আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

Questions about Raksu's financial transparency
আবুল কালাম আজাদ ,রাজশাহী:- ২৪ আগস্ট ২০২৬ ০৬:৪৩ অপরাহ্ন বিশেষ সংবাদ
আবুল কালাম আজাদ ,রাজশাহী:- ২৪ আগস্ট ২০২৬ ০৬:৪৩ অপরাহ্ন
মানা হয়নি অডিট নিয়োম ॥ রাকসুর আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) গঠনতন্ত্রে বছরে দুইবার অডিটের স্পষ্ট বিধান থাকলেও নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ১০ মাসেও একবারও অডিট হয়নি। অথচ এরই মধ্যে রাকসুর অর্থ ব্যয় নিয়ে বড় অঙ্কের বিল-ভাউচার জমা না দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে নিয়মিত অডিট না হওয়ায় রাকসুর আর্থিক ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাকসুর নেতারা এক কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা উত্তোলন করলেও এর মধ্যে ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকার ব্যয়ের বিল-ভাউচার জমা দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ‘অর্থ আত্মসাতের’ অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল বিক্ষোভ করে। পরে সংগঠনটি ব্যঙ্গ করে ক্যাম্পাসে ‘ভাউচার মেলা’ আয়োজন করে।

তবে বিল-ভাউচার জমা না দেওয়ার বিষয়টি অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়। এর আগে থেকেই রাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্ধারিত অডিট না হওয়ায় এখন সেই তদন্ত ও আর্থিক জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা আরও সামনে এসেছে।

 মানা হয়নি অডিটের বিধান:-
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের আওতায় পরিচালিত। ওই অধ্যাদেশের ১২তম অধ্যায়ে রাকসু-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধান রয়েছে। এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ছাত্র সংসদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মেয়াদের এক বছরে দুইবার রাকসুর যাবতীয় কার্যক্রম তদারকির জন্য অডিট বোর্ড গঠনের কথা বলা হয়েছে।
বিধান অনুযায়ী, রাকসুর সভাপতি তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মনোনীত দুই শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষকে নিয়ে অডিট বোর্ড গঠিত হওয়ার কথা। রাকসুর নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) বোর্ডের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন; তবে তিনি বোর্ডের সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন না।কিন্তু ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচনের পর প্রায় ১০ মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অডিট হয়নি।

কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা :-
অডিট না হওয়ার বিষয়ে রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “অডিট না হওয়ার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ নেই।”
তবে রাকসুর মেয়াদ শেষে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংসদের কার্যক্রম নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী অডিট টিমের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান বলেন, গঠনতন্ত্রে বছরে দুইবার অডিটের কথা থাকলেও দীর্ঘদিন রাকসু কার্যকর ছিল না। নতুন করে কার্যক্রম শুরুর পর সবকিছু বুঝে নিতে এবং বাজেট পেতে প্রায় ছয় মাস সময় লেগেছে। ফলে প্রথম ছয় মাসে রাকসুর কার্যক্রম তেমনভাবে শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে কার্যক্রম শুরু হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে অডিট করা সম্ভব হয়নি।

রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, “অডিটের বিষয়ে বারবার কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। তারা বছর শেষে অডিট করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জেনেছি।”
তিনি বলেন, “আমরাও মূলত জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে কার্যক্রম শুরু করতে পেরেছি। এ কারণে অডিটসহ কিছু কার্যক্রম সময়মতো করা সম্ভব হয়নি।”

অডিট না হওয়ায় প্রশ্ন ছাত্র সংগঠনগুলোর
নির্ধারিত সময়ে অডিট না হওয়ায় রাকসুর অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট:-
গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের মুখপাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, রাকসুর সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় রাখতে পারেননি। একই সঙ্গে বছরে দুইবার অডিটের নিয়মও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ভাউচার-সংক্রান্ত অনিয়মের দায় রাকসুর সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের ওপরও বর্তায়।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল:-
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, নিয়মিত অডিটের হিসাব প্রকাশ ও উপস্থাপন না করা হলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এরই মধ্যে অর্থ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনিয়ম ও অসংগতির অভিযোগ সামনে এসেছে। তাই রাকসুর অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং বর্তমান কোষাধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

ছাত্র অধিকার পরিষদ:-
ছাত্র অধিকার পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, “ছয় মাস পরপর নিয়মিত অডিট করা হলে বর্তমানে ভাউচার নিয়ে যে প্রশ্ন ও সংকট তৈরি হয়েছে, তা হয়তো এতটা বড় আকার ধারণ করত না। অডিট না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই রাকসুর আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।”

নিয়ম বনাম বাস্তবতা:-
রাকসুর গঠনতন্ত্রে অডিটের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলেও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে উঠে এসেছে কার্যক্রম শুরুতে বিলম্ব ও বাজেট-সংক্রান্ত জটিলতার কথা। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—নির্ধারিত সময়ে অডিট না করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিকভাবে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না এবং অডিট বোর্ড গঠনের উদ্যোগই বা নেওয়া হয়েছিল কি না।

সাম্প্রতিক ভাউচার বিতর্কের পর বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ নিয়মিত অডিট শুধু অর্থ ব্যয়ের হিসাব যাচাইয়ের বিষয় নয়; এটি রাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। ফলে নির্ধারিত সময়েই অডিট না হলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।