‘তুমি আমার মেয়ে নও’, দত্তকের ১৫ বছর পর পরিচয় সংকটে পায়েল

Payal faces identity crisis after 15 years of adoption
অনলাইন ডেস্ক ১৩ জুন ২০২৬ ০৫:১৭ অপরাহ্ন সারা বাংলা
অনলাইন ডেস্ক ১৩ জুন ২০২৬ ০৫:১৭ অপরাহ্ন
‘তুমি আমার মেয়ে নও’, দত্তকের ১৫ বছর পর পরিচয় সংকটে পায়েল
--সংগৃহীত ছবি

জন্মের পরে যাদেরকে মা-বাবা বলে চিনে-জেনে বড় হয়েছেন, এখন শুনছেন তিনি তার আপন কেউ নন। এমন ঘটনা ঘটেছে রাজশাহীর প্রখ্যাত চিকিৎসক শিপ্রা চৌধুরীর পালিত মেয়ে ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েলের জীবনে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে নিজের সন্তান পরিচয়ে বড় করার পর, ডাক্তার শিপ্রা হঠাৎ করেই পায়েলের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক অস্বীকার করে নথিপত্র থেকে তার নাম মুছে ফেলেন। 

এই সিদ্ধান্তে কিশোরী পায়েলের শিক্ষাজীবন ও আইনি পরিচয় চরম সংকটের মুখে পড়েছে। বর্তমানে প্রকৃত অভিভাবকত্ব নিয়ে এক গোলকধাঁধায় বন্দি পায়েল। এমন পরিস্থিতিতে পায়েলের কথিত জন্মদাতা পিতা-মাতাও তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ জুন হঠাৎ পায়লকে জানানো হয় শিপ্রা চৌধুরী তার মা নন। তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া ছাড়াও কৌশলে ক্লাউডিয়ার একাডেমিক জন্মনিবন্ধন, জেএসসি, এসএসসির সনদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে বাবা-মা হিসেবে থাকা ডা. শিপ্রা চৌধুরী ও ওবায়দুর রহমান চৌধুরীর নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। এমনকি মেয়ের নামে হেবা দলিলে দেওয়া ৫ কাঠা জমি ফেরত নিতেও মামলা করা হয়েছে। 

পায়েলের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় চাপ প্রয়োগ করে কাগজপত্র ও এফিডেভিটে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। তার নামে থাকা জমি নিয়েও বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরিচয় পরিবর্তনের পর কলেজে ভর্তি ও জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করতে গিয়ে জটিলতায় পড়তে হয়েছে তাকে। ক্লাউডিয়া বলেন, আমি শুধু জানতে চাই, কেন আমার পরিচয় বদলে দেওয়া হলো? কেন আমাকে এতদিনের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলো?

জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি ডা. শিপ্রা চৌধুরী ক্লাউডিয়া চৌধুরীর বাবা-মায়ের নাম সংশোধন বা পরিবর্তনের জন্য রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) আট নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে আবেদন করেন। এর তিনদিন আগে, ৪ জানুয়ারি, শিপ্রা চৌধুরী কৌশলে ক্লাউডিয়ার বাবা মো. বাবুল ও মা মোসা. টগরী বেগমের নাম উল্লেখ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরযুক্ত একটি নাগরিক ও চারিত্রিক সনদপত্র ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে জমা দেন।

এভাবেই জন্মনিবন্ধন থেকে ডা. শিপ্রা চৌধুরী ও তার স্বামীর নাম বাদ দেওয়া হয়। পরে ক্লাউডিয়ার সব একাডেমিক কাগজপত্রেও বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তন করা হয়। তবে পরিবর্তিত জন্মসনদে ক্লাউডিয়ার মায়ের নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মোসা. টগরী বেগমের নাম। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই টগরী বেগমও ক্লাউডিয়ার জৈবিক মা নন। 

মোসা. টগরী বলেন, ক্লাউডিয়া আমার গর্ভের সন্তান নয়। ক্লাউডিয়ার ফুফা মো. আরশাদ আলী জানান, ছোটবেলায় শিশুটিকে এমন শর্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যে, তার জৈবিক পরিবার আর কখনো তার পরিচয় প্রকাশ করতে পারবে না কিংবা যোগাযোগও রাখতে পারবে না।

ক্লাউডিয়ার জৈবিক বাবা হিসেবে পরিচয় পাওয়া মো. বাবুল বলেন, ২০০৮ সালে মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার সময় কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়েছিল, তারা ভবিষ্যতে মেয়ের ওপর কোনো দাবি করতে পারবেন না। তিনি বলেন,  শুনলাম মেয়ের সব কাগজপত্রে আমাদের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মেয়ে তো আমাকে চেনেই না বাবা হিসেবে। আমার মেয়ের বয়স যখন ১১ মাস, তখন তাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। আমি মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি; কিন্তু সে আমাকে বাবা হিসেবে চেনে না, কথা বলতেও আগ্রহ দেখায় না। 

এ বিষয়টি নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাহামুদুল হক হায়দারী বলেন, তৎকালীন চেয়ারম্যানের মাধ্যমে শিশুটিকে দত্তক নেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য তারা আমার কাছে একটি প্রত্যয়নপত্র চেয়েছিলেন। যাচাই-বাছাই করে আমরা সেটি দিয়েছিলাম। এরপর সেই প্রত্যয়ন ব্যবহার করে তারা কী করেছেন, সে বিষয়ে আমি অবগত নই। তিনি আরও বলেন, শুনেছি জন্মনিবন্ধনের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।

কীভাবে বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তন করা হলো—জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ২০০৮ সালে ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েলের জন্মনিবন্ধনের জন্য ডা. ওবায়দুর রহমান চৌধুরী ও ডা. শিপ্রা চৌধুরী নিজেদের বাবা-মায়ে পরিচয়ে আবেদন করেছিলেন।

তাদের স্বাক্ষরের ভিত্তিতেই জন্মনিবন্ধন করা হয়। তবে ২০২৩ সালে ডা. শিপ্রা চৌধুরী আবার এসে জানান, ক্লাউডিয়া তাদের জৈবিক সন্তান নন; তিনি দত্তক সন্তান ছিলেন। এরপর জন্মনিবন্ধনে বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তনের আবেদন করা হয়। ওয়ার্ড সচিবের ভাষ্য, আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম। কারণ একজন মানুষের বাবা-মা তো একজনই হয়। কিন্তু পরে তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের (এএম মাহবুবুল হক পাভেল) অনুমোদনের পর নতুন নাম সংযুক্ত করে জন্মনিবন্ধন ইস্যু করা হয়।

রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আলী আশরাফ মাসুম বলেন, জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র পরিবর্তনের নির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কিনা, তা তদন্তের বিষয়। তিনি বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের মাধ্যমেই হবে। তবে মানবিকভাবে বিষয়টির সমাধান হওয়া জরুরি। 

সার্বিক বিষয়ে জানতে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর মুঠোফোনে কল করা হলে রিসিভ করলেও কথা না বলে কেটে দেন। তাই এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

তবে অস্ট্রেলিয়া থেকে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর পুত্রবধূ শাম্মি আক্তার চৌধুরী মোবাইলে বলেন, আমার শাশুড়ির একটি মাত্র ছেলে দেশের বাইরে থাকে। তার বয়স এখন ৬০ বছরের বেশি। স্বাভাবিকভাবেই তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এজন্যই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।