শীত এখনো নামেনি, অথচ মাঠজুড়ে আগাম শীতকালীন সবজির সমারোহ। কোথাও মুলা, ফুলকপি-বাঁধাকপি, কোথাও লাউ, শিম, বেগুন ও নানা শাকের সবুজ পাতায় ছেয়ে গেছে জমি। ভোরের আলো ফুটতেই পরিচর্যা, সার প্রয়োগ ও সেচের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন কৃষকেরা। লক্ষ্য একটাই—শীত পুরোপুরি জেঁকে বসার আগেই সবজি বাজারে তুলে ভালো দাম পাওয়া। আগাম সবজি বিক্রি করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আশাও করছেন তাঁরা।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কুমিরমারা, এলেমপুর, আমিরাবাদ, রোশনাবাদ, পাখিমারা, ইসলামপুর ও নাওভাঙ্গাসহ বিভিন্ন গ্রামের মাঠে এখন এমন কর্মচাঞ্চল্য। একসময় লবণাক্ততা ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে বছরে একটি আমন ধানের ফসলের ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের অনেকেই এখন আধুনিক পদ্ধতিতে বছরজুড়ে সবজি চাষ করছেন। জমির চারপাশে উঁচু কান্দি, রেইজড বেড, পরিকল্পিত সেচ ও মালচিং পদ্ধতির ব্যবহার বদলে দিয়েছে চাষাবাদের চিত্র। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব সবজি জেলা ছাড়িয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, এ বছর কলাপাড়ায় প্রায় ৩৮০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির আবাদ হচ্ছে। এর প্রায় ৭০ শতাংশ উৎপাদিত হয় নীলগঞ্জ ইউনিয়নে। লাউ, শসা, করলা, বোম্বাই মরিচ, পেঁপে, কাঁচা মরিচ, বরবটি, মিষ্টিকুমড়া, বেগুন, তরমুজ ও টমেটোসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন কৃষকেরা।
এক ফসলি জমিতে বারো মাসের সম্ভাবনা:
কৃষকদের ভাষ্য, নীলগঞ্জের কুমিরমারা গ্রামের কৃষকেরাই প্রথম এ অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে সবজি চাষের এ পদ্ধতি শুরু করেন। পরে এর সাফল্য ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে। বর্তমানে নীলগঞ্জের পাশাপাশি মিঠাগঞ্জ, চাকামইয়া, টিয়াখালী, লালুয়া, ধানখালী ও ধুলাসার ইউনিয়নেও সবজি চাষের বিস্তার ঘটেছে।
কৃষকদের হিসাবে, প্রায় দুই যুগ ধরে এ অঞ্চলে সবজি চাষের প্রসার ঘটছে। শুরুতে জমির চারপাশে পানি নিষ্কাশন ও সংরক্ষণের জন্য নালা খনন এবং উঁচু বেড তৈরি করতে বেশি খরচ হয়। তবে জমির কাঠামো তৈরি হয়ে গেলে পরবর্তী বছরগুলোতে সেই খরচ আর লাগে না। জমির ধরন, আবহাওয়া ও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ফসল নির্বাচন করে তুলনামূলক কম জমিতেও বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন তাঁরা।
আগে বর্ষা ও লবণাক্ততার কারণে বছরের বড় একটি সময় কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে থাকত। অনেক পরিবার মাছ ধরা কিংবা দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল ছিল। সবজি চাষের বিস্তার সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এনেছে। কৃষিকাজে নিয়মিত আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পরিবারগুলোর ঋণ পরিশোধ, সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের ব্যয় মেটানোর সক্ষমতাও বেড়েছে।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজি পাখিমারা বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন কৃষকেরা। এ বাজারকে কেন্দ্র করেই নীলগঞ্জের উৎপাদিত সবজি ‘পাখিমারার সবজি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পাইকারদের মাধ্যমে এসব সবজি যাচ্ছে জেলার বাইরের বিভিন্ন বাজারে, এমনকি রাজধানীতেও।
আগাম সবজিতে খরচ বেশি, লাভের আশাও বেশি:
আগাম সবজি চাষে জমি প্রস্তুত, উন্নত বীজ সংগ্রহ, সেচ, সার প্রয়োগ, আগাছা দমন ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে বাড়তি খরচ ও পরিশ্রম করতে হয়। তবে মৌসুমের শুরুতে বাজারে সবজির সরবরাহ কম থাকায় ভালো দাম পাওয়ার আশায় কৃষকেরা আগাম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
কুমিরমারা গ্রামের প্রবীণ কৃষক সুলতান গাজী বলেন, ‘আগাম সবজি করতে হলে জমিতে বেশি সময় দিতে হয়। সার, সেচ ও শ্রমিকের খরচও বেশি পড়ে। তবে শীতের শুরুতে বাজারে সবজির দাম ভালো থাকে। তাই পরিশ্রম বেশি হলেও আগাম সবজির আবাদ করছি।’
আরেক কৃষক মাসুম চৌধুরী বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে সবজির চাহিদা বেশি থাকে। তখন দামও ভালো পাওয়া যায়। গত বছর আগাম সবজি করে লাভ হয়েছিল।’ এ কারণে এবারও বেশি জমিতে আগাম সবজির আবাদ করছেন তিনি।
প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই, বাজারদর নিয়েও শঙ্কা:
সবজি চাষের বিস্তার ঘটলেও কৃষকদের দুশ্চিন্তা কম নয়। উপকূলীয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত আবহাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমলে কোমল চারা নষ্ট হতে পারে। রোগবালাই এবং বাজারদরের ওঠানামাও কৃষকের লাভের হিসাব পাল্টে দিতে পারে। উৎপাদন ভালো হলেও ন্যায্যমূল্য না পেলে প্রত্যাশিত লাভ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষিবিদ আরাফাত হোসেন বলেন, ‘ এবছর এখানকার কৃষকরা অন্তত পাঁচ শ’ হেক্টর জমিতে শীতকালীন আগাম শাক-সবজির আবাদ করেছেন। কৃষকেরা আগাম শীতকালীন সবজি চাষে বেশ আগ্রহী। অন্তত এক হাজার চাষী শীতকালীন আগাম আবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাঁদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কোন সবজিতে কী পরিমাণ সার প্রয়োগ করতে হবে, কখন সেচ দিতে হবে এবং রোগবালাই দেখা দিলে কী ব্যবস্থা নিতে হবে—এসব বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
সম্ভাবনার নাম নীলগঞ্জ:
একসময় যে মাঠে বছরের বড় একটি সময় ফসলের দেখা মিলত না, সেখানে এখন সবুজ সবজির সমারোহ। কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও চাষাবাদের পদ্ধতিগত পরিবর্তনে নীলগঞ্জের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ অগ্রযাত্রা টেকসই করতে প্রয়োজন নিয়মিত কারিগরি সহায়তা, উন্নত বীজের সহজলভ্যতা, সাশ্রয়ী কৃষিঋণ, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং ন্যায্যমূল্যে সবজি বিক্রির নিশ্চয়তা। পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও নিরাপদ সবজি উৎপাদনে জৈব সার এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে এবং বাজারে ন্যায্য দাম মিললে আগাম সবজির এই আবাদ কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর পাশাপাশি উপকূলীয় কৃষির অর্থনীতিকেও আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে পারে।