রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে পদ্মা নদী থেকে নির্বিচারে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব। গত দুই মাসেই নদী গর্ভ থেকে লোপাট করা হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ ঘনফুট বালু, যার আনুমানিক বাজারমূল্য পাঁচ কোটি টাকা।
বৈধ ইজারার সীমানা তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজার বসিয়ে এই কারবার চালানোর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় নদীতীর ও সদ্যনির্মিত রক্ষা বাঁধ।
অন্তরালে প্রভাবশালীরা:-
নির্ধারিত লক্ষ্মীনগর বালুমহাল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর বিভিন্ন অংশ থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু তোলা হচ্ছে। পরবর্তীতে সেগুলো রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার অন্তত দশটি স্থানে স্তূপ করে চলছে রমরমা বিক্রি।
এই পুরো সিন্ডিকেটের পেছনে নাম এসেছে একাধিক রাজনৈতিক নেতার। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন:
বাঘা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখরুল হাসান বাবলু, সাবেক সদস্য সচিব আশরাফ উল দৌলা, জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক এসএম সালাউদ্দিন আহমেদ শামীম সরকার,উপজেলা যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক জুয়েল খান,স্থানীয় ব্যবসায়ী সজল খান ও পাকুড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাদের মোল্লা।
বাঁধের পাশে বালুর পাহাড় ও রসিদ বাণিজ্যের চিত্র:-
সরেজমিনে বাঘার কিশোরপুর মাদ্রাসা ঘাট এলাকায় দেখা মিলেছে একাধিক ড্রেজার ও বালুবাহী বড় নৌকার। পাম্পের মাধ্যমে পাইপ টেনে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে কিশোরপুর পদ্মার বাঁধসংলগ্ন এলাকায় বিশাল সব বালুর স্তূপ গড়ে তোলা হয়েছে। এমনকি সদ্যনির্মিত বাঁধের ওপরও বালু ফেলে চলছে বিক্রির কাজ।
পাকুড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাদের মোল্লার দাবি, তারা ইজারাদার আরফান মিয়ার কাছ থেকে প্রতি ঘনফুট ৩ টাকা দরে কিনে, ১০ টাকায় বিক্রি করছেন। তার ভাষ্যমতে, এই ব্যবসার সাথে ছাত্রদল নেতা শামীম সরকার, ব্যবসায়ী সজল খান ও বিএনপি নেতা ফখরুল হাসান বাবলুসহ বেশ কয়েকজন যৌথভাবে জড়িত।
অভিযুক্তদের বক্তব্য ও পাল্টাপাল্টি দাবি:-
কাদের মোল্লা (ইউনিয়ন বিএনপি সাধারণ সম্পাদক):,ইজারাদারের রসিদ নিয়েই ব্যবসা করার কথা স্বীকার করলেও অবৈধ উত্তোলনের দায় চাপিয়েছেন অন্য শীর্ষ নেতাদের ওপর।
সজল খান (ব্যবসায়ী): বালু ব্যবসার জন্য কিছু টাকা বিনিয়োগের কথা স্বীকার করলেও সরাসরি বালু তোলার অভিযোগ নাকচ করেছেন।
জুয়েল খান (যুবদল নেতা): ইজারাদারের কাছ থেকে বৈধভাবে বালু কিনে ব্যবসার দাবি করলেও পেশিশক্তি বা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
ফখরুল হাসান বাবলু (উপজেলা বিএনপি আহ্বায়ক): তার ও দলের নাম সম্পূর্ণ অপব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করে অবৈধ এই কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানান।
আশরাফ উল দৌলা (সাবেক সদস্য সচিব): ড্রেজার দিয়ে অবৈধ বালু তোলার কথা স্বীকার করলেও নিজের সম্পৃক্ততা উড়িয়ে দিয়ে জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের নিষেধ করেছেন।
ইজারাদারের কোটি টাকার লোকসান ও প্রশাসনের হুঁশিয়ারি:-
মেসার্স সিফাত এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ও বৈধ ইজারাদার আরফান মিয়া সরকারের কাছে সাত কোটি টাকা দিয়ে মহাল ইজারা নিয়ে এখন সর্বস্বান্ত।
তার অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্র তার প্রতিষ্ঠানের জাল রসিদ তৈরি করে অবৈধভাবে বালু বিক্রি করছে। বিষয়টি প্রশাসনকে বারবার লিখিতভাবে জানিয়েও প্রতিকার মেলেনি।
এদিকে অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করায় গোকুলপুরের শিক্ষার্থী রাতুল হাসানকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। মানববন্ধন আয়োজনেও বাধা দিয়েছে প্রভাবশালীরা বলে স্থানীয়দের অভিযোগে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বাঘার ইউএনও তকী ফয়সাল তালুকদার জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনের সত্যতা মিলেছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে গেলেই অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়, তবে নিয়মিত মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।
এছাড়া রাজশাহী জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার অভিজিত সরকার জানিয়েছেন, ইজারার বাইরে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।