
খাবার খাওয়ার পরপরই পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব কিংবা পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি এ ধরনের সমস্যাকে অনেকেই বদহজম ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু বারবার এমন উপসর্গ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
কারণ সাধারণ হজমের সমস্যা ছাড়াও পিত্তথলিতে পাথর জমার কারণে এমন ব্যথা হতে পারে।
বিশেষ করে পেটের ওপরের ডান দিকে ব্যথা হলে এবং সেই ব্যথা ডান কাঁধ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা বারবার ফিরে এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কেন পিত্তথলিতে পাথর হয়
পিত্তথলি যকৃতের নিচে অবস্থিত ছোট একটি অঙ্গ।
যকৃতে তৈরি হওয়া পিত্তরস এখানে জমা থাকে। খাবারের চর্বি হজমে সহায়তা করতে প্রয়োজন অনুযায়ী পিত্তরস ক্ষুদ্রান্ত্রে নিঃসৃত হয়।
পিত্তরসে থাকা কোলেস্টেরল বা বিলিরুবিনের ভারসাম্য নষ্ট হলে কিংবা পিত্তথলি ঠিকমতো খালি না হলে শক্ত কণার সৃষ্টি হতে পারে। সময়ের সঙ্গে এগুলো পাথরে পরিণত হয়। পাথর পিত্তরস চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি করলে ব্যথাসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
পিত্তথলিতে পাথর থাকলেও অনেকের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তবে পাথরের কারণে পিত্তরসের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।
পেটের ওপরের ডান দিকে ব্যথা: বিশেষ করে পাঁজরের নিচে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
ডান কাঁধ বা পিঠে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া: পেটের ব্যথার পাশাপাশি কাঁধের দিকে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
খাওয়ার পর ব্যথা বেড়ে যাওয়া: বিশেষ করে চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর কারও কারও ব্যথা বাড়তে পারে।
বমি বমি ভাব বা বমি: পেটের অস্বস্তির সঙ্গে এই উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘ সময় ধরে ব্যথা থাকা: একবার ব্যথা শুরু হলে তা কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। এসব লক্ষণ থাকলেই যে পিত্তথলিতে পাথর হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। অন্য রোগেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সঠিক কারণ নির্ণয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা জরুরি।
কাদের ঝুঁকি বেশি
পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। নারীদের মধ্যে এ সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে হরমোনের পরিবর্তন, গর্ভাবস্থা এবং ইস্ট্রোজেনযুক্ত কিছু ওষুধের ব্যবহারের সঙ্গে পাথর হওয়ার ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি বিষয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে:
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা। ডায়াবেটিস ও বিপাকজনিত কিছু সমস্যা। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকা। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা কিংবা দ্রুত ওজন কমানো। পরিবারে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ইতিহাস থাকা। বয়স বৃদ্ধি এবং কিছু হরমোনভিত্তিক ওষুধের ব্যবহার। অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও দ্রুত ওজন কমানোর প্রবণতাও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। শুধু চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া বা হজমের সমস্যা থাকলেই পিত্তথলিতে পাথর হবে, এমন নয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
খাওয়ার পর বারবার পেটে ব্যথা হলে নিজে থেকে বদহজমের ওষুধ খেয়ে সমস্যাটি এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। চিকিৎসক উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজন হলে পেটের আলট্রাসনোগ্রাম এবং রক্ত পরীক্ষা দিতে পারেন।
ব্যথা তীব্র হলে বা কয়েক ঘণ্টা ধরে স্থায়ী থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। এর সঙ্গে জ্বর, চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, কিংবা বারবার বমি হলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে। এসব লক্ষণ পিত্তথলি বা পিত্তনালিতে জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে।
পিত্তথলিতে পাথর থাকলেই সবার চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না। উপসর্গ, পাথরের অবস্থান এবং সম্ভাব্য জটিলতার ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করেন।
মনে রাখবেন, খাওয়ার পর পেটে ব্যথা হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। একই সমস্যা বারবার হলে অবহেলা না করে কারণ নির্ণয় করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।