দেশের রেল যোগাযোগের বড় অবকাঠামো নির্মাণে যখন হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তখন এসব প্রকল্পের দরপত্র, চুক্তি ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে।
যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু ও সিডিআরপি—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নথি ও অডিট আপত্তিতে আর্থিক ও প্রক্রিয়াগত অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে যমুনা রেলসেতু প্রকল্পেই বিশেষ নিরীক্ষায় ৩৪টি আপত্তিতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। একই সময়ে রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ—রাজধানীর খিলগাঁওয়ে রেলের জমিতে গড়ে উঠেছে ৫৬০টির বেশি স্থায়ী দোকান।
অভিযোগগুলোর কেন্দ্রে উঠে এসেছে রেলওয়ের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম। কোথাও চুক্তির শর্ত ও অর্থ পরিশোধ, কোথাও দরপত্রের বাধ্যতামূলক যোগ্যতা, আবার কোথাও ঠিকাদারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ও স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
যমুনা রেলসেতুতে ৩৪ অডিট আপত্তি:-
নথিপত্র অনুযায়ী, যমুনা রেলসেতু নির্মাণ প্রকল্পে বিশেষ নিরীক্ষায় ৩৪টি গুরুতর অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এসব আপত্তিতে বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়ম ও রাষ্ট্রের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি উঠে এসেছে।
একটি আপত্তিতে বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত ভেঙে কাজের পরিমাণ কমিয়ে এবং ইউনিট রেট বাড়িয়ে ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার কারণে সরকারের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৭২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
আরেকটি আপত্তিতে উচ্চহারে চুক্তি করে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ১ হাজার ২২১ কোটি ৬ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ নিশ্চিত না করেই ৪০৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বিল পরিশোধ, ড্রয়িং, ডিজাইন ও BOQ ছাড়াই ১২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় এবং ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণের নামে অস্বাভাবিক ব্যয়ের মাধ্যমে ১১৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা ক্ষতির অভিযোগও রয়েছে।এছাড়া প্রকল্প এলাকায় ব্যবহারের জন্য জাপান থেকে আনা বিলাসবহুল গাড়িরও কোনো হদিস পাওয়া যায়নি বলে অডিট-সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে যমুনা রেলসেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে দুদকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কালুরঘাটে এক ডিগ্রি নিয়ে বড় প্রশ্ন:-
চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নেও প্রশ্ন উঠেছে।প্রকল্পের আন্তর্জাতিক ‘টিম লিডার’ পদের জন্য বাধ্যতামূলক যোগ্যতা হিসেবে বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু SAMBO-led JV-এর মনোনীত এক প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসসি ইন এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং।
এখানেই তৈরি হয়েছে মূল প্রশ্ন—দরপত্রে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিবর্তে কৃষি প্রকৌশলের ডিগ্রিকে সমমান হিসেবে গ্রহণ করা যাবে কি না।
নথিপত্র অনুযায়ী, প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট সংশ্লিষ্ট দরদাতার কাছে গোপনীয় চিঠি পাঠিয়ে কৃষি প্রকৌশলের ওই ডিগ্রিকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমমান হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না, তা জানতে চান।
এ ঘটনায় একজন দরদাতা সংশ্লিষ্ট সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, দরপত্র জমা দেওয়ার পর কোনো দরদাতার মৌলিক যোগ্যতার ঘাটতি পূরণের সুযোগ নেই।
সিডিআরপিতে MAX-এর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন:-
সিডিআরপি প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নেও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, MAX নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের আর্থিক সক্ষমতা নির্ধারিত সীমার নিচে থাকার পরও তাদের একাধিক কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পের ITB, BDS ও Section 3 অনুযায়ী, একাধিক চুক্তির ক্ষেত্রে ‘least-cost combination’ পদ্ধতি অনুসরণের কথা। অর্থাৎ সরকারের সামগ্রিক ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দরদাতার প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়ার কথা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ITB 37.4 অনুসারে WD-1 ও WD-2 দুটি কন্ট্রাক্ট একসঙ্গে পেতে বার্ষিক সম্মিলিত নির্মাণ টার্নওভার ২২০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। কিন্তু MAX-এর টার্নওভার ২০৮ দশমিক ১৭ মিলিয়ন ডলার বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে নির্ধারিত সক্ষমতার তুলনায় ঘাটতি থাকার পরও দুটি কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না—এটাই এখন অন্যতম প্রশ্ন।
একই নিয়ম, ভিন্ন প্রয়োগ?:-
দরপত্র-সংশ্লিষ্ট নথিতে অন্যান্য দরদাতার ক্ষেত্রে Completion Certificate, SIL-4/User Certificate কিংবা Test Report-এর মতো নথিগত ঘাটতির কারণে তাদের ‘নন-রেসপন্সিভ’ ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে MAX-এর ক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও তাদের যোগ্য বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।এ কারণেই দরপত্র মূল্যায়নে অভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
খসড়া নথিতে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা সাশ্রয়ের যুক্তি দেখিয়ে MAX-কে কাজ দেওয়ার বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) সম্মতি চাওয়ার প্রস্তাব রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রেলের জমিতে ৫৬০-এর বেশি দোকান:-
মেগা প্রকল্পের বাইরে রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
রেলওয়ের ‘ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল’-এর ২০৫ নম্বর অনুচ্ছেদে রেলের জমির সীমানা রক্ষা ও অবৈধ দখল প্রতিরোধে বিভাগীয় প্রকৌশলীদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।কিন্তু রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় রেলওয়ের শতকোটি টাকা মূল্যের জমিতে ৫৬০টির বেশি স্থায়ী দোকান গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থাপনায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম চললেও রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এসব স্থাপনা টিকে থাকার এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তা পরিচালিত হওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি আল ফাত্তাহর:-
উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ের এডিজি-১ ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমানের বক্তব্য জানতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরবর্তীতেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
‘সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে ব্যবস্থা’:-
সার্বিক বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, রেলওয়ের দুর্নীতির বিষয়টি সরকার জানে। তবে নির্দিষ্ট অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্ন এখন জবাবদিহির:-
দেশের রেল অবকাঠামো সম্প্রসারণে বিপুল সরকারি ও বৈদেশিক অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে। ফলে প্রতিটি প্রকল্পে দরপত্র থেকে শুরু করে চুক্তি বাস্তবায়ন, বিল পরিশোধ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
যমুনা রেলসেতু প্রকল্পের অডিট আপত্তি, কালুরঘাটের দরপত্রে যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, সিডিআরপিতে ঠিকাদারের সক্ষমতা নিয়ে অভিযোগ এবং খিলগাঁওয়ে রেলের জমি দখলের অভিযোগ—সব মিলিয়ে রেলওয়ের প্রকল্প ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার। তবে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থে বাস্তবায়নাধীন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রতিটি অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত, নথির স্বাধীন যাচাই এবং দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।