অভিযোগ উঠলেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কোনো শিক্ষককে সরাসরি শাস্তি দেওয়া হয় না। অভিযোগের ধরন ও গুরুত্ব অনুযায়ী শুরু হয় প্রাথমিক অনুসন্ধান, ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং বা তদন্ত। নেওয়া হয় সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, যাচাই করা হয় নথিপত্র ও অভিযোগের তথ্য। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে শুরু হয় পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। প্রয়োজন হলে গঠন করা হয় পৃথক তিন সদস্যের ইনকোয়ারি কমিটি। সবশেষে তদন্ত ও ইনকোয়ারি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে শাস্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অভিযোগে রাবির একাধিক শিক্ষককে শাস্তির আওতায় আনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে তদন্ত এবং শেষ পর্যন্ত শাস্তি দেওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগ উঠলে প্রথমেই কী হয় :-
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর অভিযোগের ধরন ও গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রশাসন প্রাথমিক অনুসন্ধান, ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি কিংবা তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারে।
তদন্ত কমিটি অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ, বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করে প্রতিবেদন দেয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উঠে এলে পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
রাবির রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ইফতেখারুল আলম মাসউদ বলেন, “অভিযোগের মাত্রা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তদন্ত কমিটি গঠনের দরকার হলে ভিসি স্যার সিন্ডিকেট সাপেক্ষে সেটা করেন। তদন্ত কমিটি রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর সেটা সিন্ডিকেট সভায় খোলা হয় এবং রিপোর্ট অনুমোদন করা হয়।”
অভিযোগ উঠলেই কি শাস্তি :-
শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষককে চূড়ান্তভাবে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়।
অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর অভিযুক্ত শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শোকজ করা হয়। সেখানে অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য, ব্যাখ্যা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকে।
অভিযোগের ধরন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নথির সংখ্যা বেশি হলে তদন্তে সময়ও বেশি লাগতে পারে। এ প্রক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই বলে জানিয়েছেন রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ইফতেখারুল আলম মাসউদ।
তদন্ত কমিটির কাজ :-
তদন্ত কমিটির প্রধান কাজ হলো অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা। এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া, প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ এবং অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করা হয়।
তদন্ত শেষে কমিটি প্রশাসনের কাছে প্রতিবেদন দেয়। ওই প্রতিবেদনে অভিযোগের বিষয়ে কমিটির পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ থাকতে পারে।
তবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনই চূড়ান্ত শাস্তির সিদ্ধান্ত নয়। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।
তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী হয় :-
রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ইফতেখারুল আলম মাসউদ বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে শাস্তির সুপারিশ থাকলে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তের একজন প্রতিনিধিসহ তিন সদস্যের আরেকটি ইনকোয়ারি কমিটি গঠন করা হয়।
এই কমিটি বিষয়টি আরও পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেয়। এরপর ওই প্রতিবেদন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করা হয়।
রাবির সিন্ডিকেট সদস্য নিজাম উদ্দিনও একই প্রক্রিয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর শাস্তির সুপারিশ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষ থেকেও একজন সদস্য থাকার সুযোগ থাকে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সিন্ডিকেটে:-
তিন সদস্যের কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন, অভিযুক্তের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে সিন্ডিকেট শাস্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তবে চূড়ান্ত কমিটির প্রতিবেদন আসার আগে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিন্ডিকেট সদস্য নিজাম উদ্দিন।
তিনি বলেন, প্রয়োজন মনে করলে সিন্ডিকেট বা উপাচার্য বিষয়টি রিভিউ করতে পারেন। প্রয়োজনে রিভিউ কমিটিও গঠন করা যেতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী গঠিত চূড়ান্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সাধারণত আর পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকে না।
কোন অপরাধে কী ধরনের শাস্তি :-
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাবিতে বিভিন্ন অভিযোগে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চাকরিচ্যুতি, বরখাস্ত, পদাবনতি এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতির মতো শাস্তি রয়েছে।
গত পাঁচ বছরে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক প্রভাস কুমার, মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উম্মে হাবিবা জেসমিন এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সালমা খাতুনকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এছাড়া আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগরকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
পাঁচ বছরে একাধিক শিক্ষক শাস্তির আওতায়:-
যৌন হয়রানি, একাডেমিক অনিয়ম, দুর্নীতি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত পাঁচ বছরে রাবির একাধিক শিক্ষককে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। অভিযোগের ধরন ও প্রমাণের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তির ধরনেও পার্থক্য রয়েছে।
রাবির উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই আমরা সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিই না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত কমিটি করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
তিনি বলেন, “শিক্ষক-কর্মকর্তা যেই হোন না কেন, অনিয়ম, দুর্নীতি বা যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের ছাড় দেবে না। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।”