Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | www.bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Friday , ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৫ অপরাহ্ন

চার বছরেই অচল ১৮ ইঞ্জিন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ৬৮০ কোটি টাকার রক্ষণাবেক্ষন চুক্তির উদ্যোগ রেলের

আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিবেদক :- ১৬ অক্টোবর ২০২৬

২০ বছর আয়ুষ্কালের কথা থাকলেও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান হুন্দাই রোটেমের কাছ থেকে কেনা ৩০টি লোকোমোটিভের মধ্যে ১৮টিই চার বছরের মধ্যে অচল হয়ে পড়েছে। ৯৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা এসব ইঞ্জিন সচল রাখতে এবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান প্রগ্রেস রেলের সঙ্গে তিন বছরের জন্য ৬৮০ কোটি টাকার রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ চুক্তি করতে চায় বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার অনুমোদন এখনো বাকি।


ইঞ্জিনসংকটে পূর্বাঞ্চলে কনটেইনার পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে আটটি কনটেইনার ট্রেনের মধ্যে নিয়মিত চলছে মাত্র দুটি। একই সঙ্গে বিভিন্ন রুটে পাঁচটি যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে রেলওয়ের আয় কমার পাশাপাশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।


রেলওয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রগ্রেস রেল পূর্বাঞ্চলের হুন্দাই রোটেমের ৩০টি এবং পশ্চিমাঞ্চলের আরও ৪০টি লোকোমোটিভের রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও কারিগরি সহায়তা দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশি প্রতিনিধি দেশ ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে এসব সেবা দেওয়া হবে।


রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, লোকোমোটিভ কেনার সময় দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা হয়নি। এখন ইঞ্জিনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করতে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চলাচল শুরু করা ইঞ্জিনগুলোর একটি ২০২৩ সালে অচল হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালে অচল হয় আরও চারটি। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১০টিতে। চলতি বছরের জুনে অচল ইঞ্জিনের সংখ্যা বেড়ে হয় ১৮টি।


রেলওয়ের যান্ত্রিক বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সংকট এবং প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তা না থাকায় ইঞ্জিনগুলো মেরামত করা যাচ্ছে না। ২০২৪ সালে হুন্দাই রোটেমের কারিগরি সহায়তা শেষ হওয়ার পর নিজস্ব ওয়ার্কশপ ও জনবল দিয়ে ইঞ্জিনগুলো সচল রাখার চেষ্টা করছে রেলওয়ে।


পাহাড়তলী রেলওয়ে ডিজেল ওয়ার্কশপের যান্ত্রিক প্রকৌশলী ও ওয়ার্কস ম্যানেজার এহতেশাম মো. শফিক বলেন, ইঞ্জিনের সেন্সরে বিকল্প যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা যায় না। ফলে প্রস্তুতকারক বা অনুমোদিত সরবরাহকারীর সহায়তা ছাড়া মেরামত কঠিন। তাঁর ভাষ্য, ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পাঁচটি ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। হুন্দাই রোটেমের কারিগরি দল সেগুলো মেরামত করলেও পরে আবার সমস্যা দেখা দেয়। কোম্পানির দল চলে যাওয়ার পর রেলওয়ের কর্মীরা ইঞ্জিনগুলো সচল রাখতে পারেননি।


রেলওয়ের পরিচালক (লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণ) সাইফুল ইসলাম জানান, ইঞ্জিন মেরামতে কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট সফটওয়্যার প্রয়োজন। কিছু যন্ত্রাংশও নির্দিষ্ট প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। বর্তমান ব্যবস্থায় রেলওয়ের পক্ষে এসব চাহিদা পূরণ করা কঠিন।


রেলওয়ের পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৮৭৮টি কনটেইনার ট্রিপ পরিচালিত হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৬৭টিতে। একই সময়ে কনটেইনার পরিবহন থেকে আয় ২৯৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা থেকে কমে ১৬৩ কোটি ৩১ লাখ টাকায় নেমে আসে।

কনটেইনার ট্রেন পরিচালনায় দৈনিক গড় ইঞ্জিন বরাদ্দও কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে গড়ে ১১টি ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়া হলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আটটি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছয়টি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র তিনটিতে নেমে আসে।


রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা শফিকুর রহমান বলেন, ১৮টি ইঞ্জিন অচল থাকায় সময়সূচি অনুযায়ী কনটেইনার ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। সীমিতসংখ্যক ইঞ্জিন দিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেন চালানোকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। এতে রেলওয়ের লাভজনক কনটেইনার পরিবহন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম-টাঙ্গাইল, ঢাকা-নোয়াখালী ও লাকসাম-নোয়াখালী রুটে পাঁচটি যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ হয়েছে। চট্টগ্রাম ও লাকসাম জংশন স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, এসব ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ২০০ যাত্রী যাতায়াত করতেন। এদিকে, ইঞ্জিনসংকটে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সোনার বাংলা এক্সপ্রেসের যাত্রাও গত জুলাই থেকে বিভিন্ন সময়ে ১৫ মিনিট থেকে আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত পিছিয়েছে।


হুন্দাই রোটেমের কাছ থেকে দুই দফায় ৩০টি লোকোমোটিভ কেনে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৮ সালে ২৯৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় ১০টি এবং ২০১৯ সালের চুক্তিতে ৬৭৪ কোটি ৯ লাখ টাকায় আরও ২০টি ইঞ্জিন কেনা হয়।


প্রথম দফায় কেনা ১০টি ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্তের সঙ্গে সরবরাহ করা কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের অমিল পায় রেলওয়ের তদন্ত কমিটি। এসব যন্ত্রাংশের মধ্যে কম্প্রেসর ও ট্র্যাকশন মোটরও ছিল। পরে ইঞ্জিন কেনা ও গ্রহণে অনিয়মের অভিযোগে ২০২৫ সালে রেলওয়ের তিন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ওই ১০টি ইঞ্জিনের ছয়টি বর্তমানে পাহাড়তলী ডিজেল ওয়ার্কশপে অচল অবস্থায় রয়েছে।


বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. শামসুল হক বলেন, ইঞ্জিন কেনার আগেই দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ ও কারিগরি সহায়তার ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তাঁর মতে, এ বিষয়ে যথাযথ পরিকল্পনা না করার জন্য ক্রয় পরিকল্পনা ও অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।


রেলওয়ের প্রস্তাবে তিন বছরের জন্য প্রায় ৬৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে কর্মীদের বেতন, পরামর্শক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খাতে প্রায় ৩০ কোটি টাকা এবং বাকি প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার বেশির ভাগ যন্ত্রাংশ কেনায় ব্যয় হওয়ার কথা। চুক্তি কার্যকর হলে ৭০টি ইঞ্জিনের প্রাপ্যতা প্রায় ৯৫ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করছে রেলওয়ে।


অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক আনোয়ারুল ইসলাম জানান, প্রস্তাবটি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছে। তবে অর্থ বিভাগসহ অন্যান্য সরকারি সংস্থার অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি। কয়েকটি সংস্থা কিছু বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে। সেগুলোর জবাব প্রস্তুত করে প্রস্তাবটি পুনরায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।


দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনার অভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ইঞ্জিন অচল হয়ে পড়ার পর এখন বিপুল অর্থের নতুন চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। ফলে চুক্তির ব্যয়, কারিগরি সহায়তার শর্ত এবং ইঞ্জিনগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আগের ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনা ও জবাবদিহির ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




ছবি - বিজয় বাংলা