Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | www.bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Tuesday , ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৩:৫১ অপরাহ্ন

৩৩৬ কোটি টাকার রূপপুর রেলপথে নেই ট্রেন ॥ ৩০ ইঞ্জিনের হিসাবও অস্পষ্ট

আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি:- ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারী যন্ত্রপাতি ও মালামাল পরিবহনের সুবিধার্থে প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঈশ্বরদী-রূপপুর রেলপথ উদ্বোধনের সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শুরু হয়নি কোনো বাণিজ্যিক ট্রেন চলাচল। ২৬ দশমিক ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েলগেজ এই রেলপথ বর্তমানে মূলত শান্টিং, খালি মালবাহী ওয়াগন রাখা এবং রেলওয়ের সীমিত আনুষঙ্গিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

রেলপথটি নির্মাণের সময় বলা হয়েছিল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভারী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী সহজে পরিবহনের পাশাপাশি ঈশ্বরদী ইপিজেডের পণ্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এমনকি রেলপথটি চালু হলে উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যেও নতুন গতি আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন সংশ্লিষ্টরা।

কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে রেলওয়ের পাকশী বিভাগের কর্মকর্তারাই জানিয়েছেন, উদ্বোধনের পর থেকে এই পথে এখনো কোনো বাণিজ্যিক ট্রেন চলেনি। কোথাও কোথাও দীর্ঘদিনের অযত্নে রেললাইনের আশপাশে কাশবন, লতাপাতা ও জঙ্গল গজিয়ে ওঠার তথ্যও উঠে এসেছে।

২৬.৫২ কিলোমিটার রেলপথ, ব্যয় ৩৩৬ কোটি:-

ঈশ্বরদী বাইপাসের টেক-অফ পয়েন্ট থেকে পাকশীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৫২ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল কাজ শুরু হয়ে ২০২২ সালের ৩০ জুন প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হয়। ভারতের জিপিটি এবং বাংলাদেশের এসইএল ও সিসিএল যৌথভাবে নির্মাণকাজটি বাস্তবায়ন করে।

প্রকল্পের আওতায় ১৩টি লেভেল ক্রসিং গেট, একটি ‘বি’ শ্রেণির স্টেশন ভবন, একটি প্ল্যাটফর্ম ও সাতটি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। ঈশ্বরদী জংশন স্টেশনের লুপলাইন সংস্কার ও প্ল্যাটফর্ম উন্নয়নের পাশাপাশি কম্পিউটারাইজড ইন্টারলকিং ব্যবস্থাও চালু করা হয়। ফলে ঈশ্বরদী জংশনে একসঙ্গে ১৮টি ট্রেন দাঁড়ানোর সুবিধা তৈরি হয়।

ইঞ্জিন পরীক্ষার জন্যও তৈরি হয়েছিল বিশেষ ডকপিট:-

প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—রূপপুরের জন্য পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের কথা মাথায় রেখে ঈশ্বরদী লোকোমোটিভ কারখানায় বিশেষ ডকপিট নির্মাণ করা হয়। প্রকল্প-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, ওই ডকপিটে একই সময়ে একটি মিটারগেজ ও নয়টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব।

অর্থাৎ, রূপপুরের মালামাল পরিবহনের জন্য শুধু রেললাইন নয়, লোকোমোটিভ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অবকাঠামো তৈরির বিষয়টিও প্রকল্প পরিকল্পনায় ছিল।

তাহলে ‘৩০টি ইঞ্জিন’ কোথায়?:-

রূপপুরকে ঘিরে ৩০টি রেল ইঞ্জিন রয়েছে বা রূপপুরের জন্য ৩০টি ইঞ্জিন বরাদ্দ করা হয়েছে—এমন তথ্যের পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ রেলওয়ের ৩০টি লোকোমোটিভের একটি আলাদা বহর থাকার তথ্য আছে; কিন্তু সেটিকে সরাসরি রূপপুর প্রকল্পের ৩০টি ইঞ্জিন হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।

প্রশ্ন হলো—রূপপুর প্রকল্পের জন্য বাস্তবে কতটি লোকোমোটিভ নির্ধারিত ছিল বা রয়েছে, কোন নম্বরের ইঞ্জিনগুলো সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে, এসব ইঞ্জিন কোন শেড বা ডিপো থেকে পরিচালিত হয়েছে এবং বর্তমানে সেগুলোর কতটি সচল।তবে রেলওয়ের কাছে সংশ্লিষ্ট লোকোমোটিভের নম্বর, বরাদ্দ, চলাচল ও রক্ষণাবেক্ষণের রেকর্ড থাকার কথা।

রেলওয়ে তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ের ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ (সিরিজ ৩০০১–৩০৩০)। দক্ষিণ কোরিয়ার Hyundai Rotem/EMD থেকে এগুলো আনা হয়; মোট ব্যয় ছিল প্রায় ১,১৪৮ কোটি টাকা।

ট্রেন নেই, কিন্তু অবকাঠামো প্রস্তুত:-

রেলওয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রূপপুর প্রকল্পের প্রয়োজনেই রেলপথ ও স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুযায়ী এটি ব্যবহার করবে। পাকশী বিভাগের ডিআরএম আবু হেনা মোস্তফা আলমের ভাষ্য, এখন হয়তো ব্যবহার কম, তবে ভবিষ্যতে রূপপুর প্রকল্পের কাজে রেলপথটির ব্যবহার বাড়তে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—যে অবকাঠামোটি মূলত একটি মেগা প্রকল্পের ভারী মালামাল পরিবহনের জন্য নির্মিত, সেটি নির্মাণের কয়েক বছর পরও কার্যকরভাবে ব্যবহার না হওয়ার কারণ কী?

প্রকল্পটি নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছিলেন, রূপপুরের পাশাপাশি ঈশ্বরদী ইপিজেডের পণ্যও এই রেলপথে পরিবহন করা হবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর থেকে পণ্য আনা-নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা বলছে, সেই সম্ভাবনা এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি।

অব্যবহৃত রেলপথে বাড়ছে অযত্নের চিহ্ন:-

দীর্ঘদিন নিয়মিত ট্রেন চলাচল না করায় রেলপথটির বিভিন্ন অংশে আগাছা ও লতাপাতা বেড়ে ওঠার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এ অবস্থায় শুধু রেললাইন নির্মাণের ব্যয় নয়, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্টেশন, ইন্টারলকিং ব্যবস্থা, ডকপিট, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের কার্যকারিতাও মূল্যায়নের দাবি উঠছে।

হার্ডিঞ্জ সেতু ও ভারী মালামাল পরিবহনের প্রশ্ন:-

সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে রূপপুর রেলস্টেশন থেকে বের হওয়ার পথে হার্ডিঞ্জ সেতুর নিচ দিয়ে ভারী মালামাল পরিবহনের বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ বলে একজন নিরাপত্তাকর্মীর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে এটি রেলপথটি চালু না হওয়ার আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি।

ফলে রেলপথটি কেন বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়নি—এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট ও নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা এখনো প্রয়োজন।

তদন্তের দাবি:-

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের অন্যতম বৃহৎ মেগা প্রকল্প। এর মালামাল পরিবহনের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত একটি পৃথক রেলপথ যদি দীর্ঘ সময় কার্যকরভাবে ব্যবহার না হয়, তাহলে প্রকল্পটির পরিকল্পনা, ব্যবহারযোগ্যতা ও অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।

বিশেষ করে,রেলপথটি নির্মাণের সময় কতটি লোকোমোটিভ প্রয়োজন হিসাব করা হয়েছিল, বাস্তবে কতটি ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে, ইঞ্জিনগুলোর নম্বর কী, কোন ডিপো থেকে এগুলো পরিচালিত হয়েছে, কতটি সচল, কতটি মেরামতাধীন এবং রূপপুরের জন্য কোনো ইঞ্জিন আলাদাভাবে বরাদ্দ করা হয়েছিল কি না—এসব তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।

একই সঙ্গে রূপপুর রেলপথে এ পর্যন্ত কতটি ট্রায়াল, শান্টিং বা খালি ওয়াগন চলাচল করেছে, সেসবের লগবুক ও অপারেশনাল রেকর্ডও প্রকাশ করা হলে প্রকল্পটির বাস্তব ব্যবহার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের সুফল কোথায়?:-

৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২৬ দশমিক ৫২ কিলোমিটার রেলপথের উদ্দেশ্য ছিল রূপপুরের ভারী মালামাল পরিবহনকে সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী করা। কিন্তু উদ্বোধনের সাড়ে তিন বছর পরও যদি বাণিজ্যিক ট্রেন না চলে, তাহলে প্রকল্পটির বর্তমান ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন প্রয়োজন।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, রূপপুর প্রকল্পের প্রয়োজন হলে রেলপথটি ব্যবহার করা হবে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে শুধু ‘ভবিষ্যতে ব্যবহার হবে’—এমন আশ্বাস যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুস্পষ্ট অপারেশনাল পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জবাবদিহি।

আর ‘রূপপুরে ৩০টি ইঞ্জিন’ থাকার যে তথ্যটি আলোচনায় এসেছে, সেটির সত্যতা যাচাইয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোমোটিভ বরাদ্দ ও চলাচল রেজিস্টার ঘাটলেই পাওয়া যাবে।

ছবি - বিজয় বাংলা