
দেড় বছর ধরে সংস্কারের নামে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে রাজশাহী নগরীর বর্ণালী মোড় থেকে জাদুঘর হয়ে সাহেববাজারমুখী গুরুত্বপূর্ণ সড়কে। কাজ শেষ না হওয়ায় খানাখন্দ, ধুলা-কাদা ও জলাবদ্ধতায় প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন হাজারো মানুষ।
এর মধ্যে হেতমখাঁ এলাকার চৌধুরী পুকুরপাড়ে সড়কের পাশে কোনো সুরক্ষাবেষ্টনী না থাকায় তৈরি হয়েছে আরও বড় ঝুঁকি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুকুরে পড়ে পথচারী কিংবা যানবাহনের আরোহীদের প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
নগরীর উপশহর, তেরখাদিয়া ও ডাবতলা থেকে সাহেববাজারে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান এই সড়কটি প্রতিদিন ব্যস্ত থাকে। সড়কটির দুই পাশে বসতি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পথচারী ও যানবাহনের চাপ থাকে।
বিশেষ করে মুসলিম হাই স্কুল ও বহুমুখী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করে। ফলে সড়কের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।
সংস্কারকাজেই ভোগান্তি:-
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে সংস্কারকাজ চললেও সড়কটি পুরোপুরি চলাচলের উপযোগী হয়নি। কোথাও উঁচু-নিচু, কোথাও খানাখন্দ; আবার বৃষ্টির পানি জমে সৃষ্টি হচ্ছে কাদা ও পিচ্ছিলতা। ফলে রিকশা, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চালকদের পাশাপাশি সাধারণ পথচারীদেরও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কের বিভিন্ন অংশে পানি জমে যায়। কোথাও কোথাও হাঁটুসমান পানি জমায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে একদিকে যাত্রীদের সময় বাড়ছে, অন্যদিকে যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
পুকুরপাড়ে নেই গার্ডওয়াল:-
সড়কের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোর একটি হেতমখাঁর চৌধুরী পুকুরপাড়। স্থানীয়দের ভাষ্য, সড়কের একেবারে পাশে পুকুর থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত গার্ডওয়াল বা সুরক্ষাবেষ্টনী নেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, রাতে কম দৃশ্যমানতা কিংবা বৃষ্টির সময় কোনো পথচারী ভারসাম্য হারালে অথবা কোনো যানবাহনের চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে সেটি সরাসরি পুকুরে পড়ে যেতে পারে।
স্কুলগামী শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা:-
চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা শিশির বলেন, ‘বাড়ির সামনে পুকুর ঘেঁষে রাস্তাটি গেছে। অবিলম্বে পুকুরপাড় উঁচু করে দেয়াল নির্মাণ করা দরকার। তা না হলে যেকোনো যানবাহন বা পথচারী নিচে পড়ে বড় দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন।’
অসুস্থ ও বয়স্কদের দুর্ভোগ:-
‘নাজ গার্ডেন’-এর মাইনুল রেজা সনি বলেন, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে রিকশা বা অটোরিকশায় চলাচল করা অত্যন্ত কষ্টকর। সড়কের অতিরিক্ত ঝাঁকুনিতে বয়স্ক, নারী ও অসুস্থ যাত্রীদের বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। দীর্ঘক্ষণ ঝাঁকুনির কারণে অনেকের ঘাড় ও কোমরে ব্যথার মতো সমস্যাও হচ্ছে বলে তিনি জানান।
পথচারী হাসিবুল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলায় এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত ভীষণ কষ্টকর হয়ে পড়েছে। কাজ দ্রুত শেষ করা দরকার।’
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা:-
সড়কের দুরবস্থার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ও। হেতমখাঁ কাস্টমস মোড়ের ব্যবসায়ী ফয়সাল ও বাবুর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি ও চলাচলের সমস্যার কারণে বাইরের ক্রেতাদের অনেকেই এ এলাকায় আসতে চান না। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রিকশাচালক করিম বলেন, খানাখন্দে ভরা সড়কে রিকশা চালাতে গিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। মেরামতে অতিরিক্ত টাকা খরচ হওয়ায় আয় কমে যাচ্ছে।
দুই প্রকল্পের কাজ এক প্যাকেজে:-
রাজশাহী সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ১০ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সড়ক উন্নয়নকাজের দুটি প্রকল্প একত্র করে একটি প্যাকেজের আওতায় কাজটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ দুই প্রকল্পে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
তবে কাজ শুরুর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন-অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন—গুরুত্বপূর্ণ নগর সড়কের কাজ শেষ হতে এত সময় লাগছে কেন এবং বর্ষার আগে কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কোনো ঘাটতি ছিল কি না।
রাসিকের বক্তব্য:-
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) ও প্রধান প্রকৌশলী আহমদ আল মঈন (পরাগ) বলেন, ‘রাস্তার কাজ প্রায় শেষের দিকে। বর্ষার কারণে কাজ সাময়িক বন্ধ রয়েছে। আশা করছি আগামী মাসের মধ্যে বিটুমিন ও পাথর দিয়ে রাস্তাটির কাজ শেষ করতে পারব।’
চৌধুরী পুকুরপাড়ে সুরক্ষাদেয়াল নির্মাণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দ্রুত কাজ শেষের দাবি:-
নগরবাসীর প্রশ্ন, একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ত সড়কের সংস্কারকাজ যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতেই থাকে, তাহলে বিকল্প চলাচলব্যবস্থা ও পথচারীদের নিরাপত্তায় কার্যকর ব্যবস্থা কেন থাকবে না? বিশেষ করে সড়কের পাশে পুকুর থাকা সত্ত্বেও সেখানে স্থায়ী সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেশি।
স্থানীয়রা বলছেন, শুধু সড়কে বিটুমিন-পাথর ঢেলে কাজ শেষ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সড়কের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, পুকুরপাড়ের নিরাপত্তা, পথচারীদের চলাচল এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা—সবকিছু সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের দাবি, দ্রুত সড়ক সংস্কার শেষ করার পাশাপাশি চৌধুরী পুকুরপাড়ে শক্ত গার্ডওয়াল, প্রয়োজনীয় সুরক্ষাবেষ্টনী ও নিরাপদ পথচারী চলাচলের ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে দীর্ঘসূত্রতার কারণ খতিয়ে দেখে নির্ধারিত সময়ে নগরবাসীর অর্থে নেওয়া উন্নয়নকাজ শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।